বান্দরবান ও রাঙামাটির চারটি আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ, বেতন-ভাতা ও ভাতাদিতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণসহ একটি লিখিত আবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নিয়ম বহির্ভূতভাবে উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প তহবিল থেকেও বেতন ও ভাতা গ্রহণ করছেন, যা বিদ্যমান নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
অভিযোগের আওতায় থাকা বিদ্যালয়গুলো হলো—বান্দরবানের সুয়ালক ম্রো আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, রুমা উপজাতীয় আবাসিক বিদ্যালয়, আলীকদম আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় এবং রাঙামাটির রাজস্থলী উপজাতীয় আবাসিক বিদ্যালয়। এর মধ্যে সুয়ালক ও রুমা বিদ্যালয় দুটি এমপিওভুক্ত হলেও অন্য দুটি এখনও শুধুমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ‘টেকসই সামাজিক সেবা প্রদান’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তত নয়জন শিক্ষক সরকারি এমপিওভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প হিসাবেও মাসিক বেতন ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তারা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ৭ম ও ১০ম গ্রেডে বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৬ষ্ঠ ও ৮ম গ্রেডের বেতন পেয়েছেন। এ ছাড়া, সরকারি বিধান অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পাহাড়ি ভাতা বা পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা পাওয়ার যোগ্য না হলেও তারা এসব সুবিধাও নিয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এমপিওভুক্ত নয়জন শিক্ষক প্রায় ২৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকার গ্র্যাচুইটি উত্তোলন করেছেন—যা সরকারি বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। অথচ প্রকল্প নীতিমালায় গ্র্যাচুইটি প্রদানের কোনো বিধানই নেই।
সংবাদমাধ্যম ঢাকামেইলের খবরে বলা হয়েছে- শুধু আর্থিক নয়, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও রয়েছে গুরুতর অনিয়ম। রুমা উপজাতীয় আবাসিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আব্দুর রহিম তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও চাকরি পেয়েছেন। একই বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক রোকসানা আক্তারেরও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অনার্স বা মাস্টার্স নেই। এমনকি সুয়ালক ম্রো বিদ্যালয়ে বাণিজ্য বিভাগ না থাকলেও সীমা বড়ুয়াকে সেই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এসব অনিয়মে সংশ্লিষ্ট তিনজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। তারা হলেন—সুয়ালক ম্রো বিদ্যালয়ের মো. মহিন উদ্দিন, রুমা উপজাতীয় বিদ্যালয়ের সঞ্জয় মিত্র এবং রাজস্থলী উপজাতীয় বিদ্যালয়ের দুলাল হোসেন।
গণমাধ্যমটির ওই খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ করেন রুমা উপজাতীয় বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মহিন উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এ বিষয়ে মন্তব্য না করে বিষয়টি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর ন্যস্ত বলে জানান।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) সুজন চৌধুরী ঢাকামেইলকে বলেন, বিদ্যালয়গুলো প্রকল্পের বাইরে রাখা উচিত ছিল। তিনি স্বীকার করেন, একই ব্যক্তি প্রকল্প ও সরকার উভয় খাত থেকে বেতন নেওয়ার বিধান নেই। তবে এটি হয়তো পুরোনো কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে হয়ে থাকতে পারে বলেও মত দেন তিনি। আর উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান (যুগ্ম সচিব) রিপন চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন বা বার্তার কোনো জবাব দেননি।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করছেন, পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে একটি চক্র বছরের পর বছর এভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। তারা বিষয়টির দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
-পার্বত্য সময়


