পাহাড়ের সবুজ অরণ্য এখন ধ্বংসের মুখে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে নিরবে, আর এই ধ্বংসযজ্ঞে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সহযোগিতার অভিযোগ উঠছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, রাঙামাটির লংগদু এবং সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বন উজাড়ের এই চিত্র প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। বন বিভাগের উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণে এই ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
দীঘিনালা উপজেলার মাইনী নদী অববাহিকায় ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড় ও টিলা নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক সময়ের সবুজ অরণ্য। কিন্তু এখন সেই সবুজ অরণ্য প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রতিদিন কাঠ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রকাশ্যে। চলতি মৌসুমে অন্তত ৫ লাখ ঘনফুট কাঠ উজাড় হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বেআইনীভাবে কাঠ পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে চাঁদের গাড়ি (জীপ)। এই সব কাঠ সরবরাহ করা হচ্ছে ইটভাটা ও তামাক চুল্লিতে।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, রাঙামাটির লংগদু উপজেলা এবং সাজেক ইউনিয়নের অংশে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ এবং ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের ছয়টি রেঞ্জ রয়েছে। এই রেঞ্জগুলোর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতায় নারাইছড়ি রেঞ্জ, মারিশ্যা রেঞ্জ, বাঘাইহাট রেঞ্জ এবং ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের আওতায় হাজাছড়ি রেঞ্জ, লংগদু উল্টাছড়ি রেঞ্জ এবং মেরুং রেঞ্জের কাঠ পাচার রোধে রয়েছে জামতলী চেক স্টেশন। কিন্তু এই চেক স্টেশন ও রেঞ্জ কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে কাঠ পাচার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
জামতলী চেক স্টেশনের সামনে দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য কাঠ বোঝাই জীপ আসা-যাওয়া করে। এসব কাঠ যাচ্ছে অবৈধ ইটের ভাটা ও তামাক চুল্লিতে। এ ছাড়া জোতের ক্ষেত্রেও প্রতিদিন পারমিটের চেয়েও দেড় গুণ কাঠ পাচার হচ্ছে সমতলে। প্রশাসনের নাকের ডগা বেয়ে প্রতিটি ট্রাকে পারমিটের বেশি কাঠ পাচার হলেও কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
স্থানীয়রা জানান, মূলত জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এসব পাহাড় থেকে কাঠ কাটা হচ্ছে। যেসব গাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠেছে, সেগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এতে পুরো পাহাড়টি বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ে। ছোট বড় সব ধরনের গাছ কেটে নিয়ে যায় শ্রমিকেরা। দুর্গম এলাকা হওয়ায় চাঁদের গাড়িতে করে এসব কাঠ পরিবহন করা হয়।
সংবাদমাধ্যম বাংলাভিশনের অনলাইনে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা মূলত দৈনিক শ্রমিক হিসেবে পাহাড় থেকে গাছ কাটার কাজ করি। তৃতীয় একটি পক্ষ পাহাড়ের মালিক থেকে চুক্তির ভিত্তিতে পাহাড়ে সব গাছ কিনে নেয়। তারপর গাছ কেটে তা বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়।’
জামতলী চেক স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা মো. শাহীন মিয়া ওই গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি এখানে একমাস আগে যোগদান করেছি। আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছি। এখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। যোগদানের পর একটি গাড়ি আটক করেছি এবং মামলাও হয়েছে।’
তবে স্থানীয় পরিবেশ কর্মীরা বলছেন, বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্নীতির কারণে বন উজাড় হচ্ছে। পিটাছড়া বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ রাসেল বলেন, ‘অনুমতি ছাড়া অশ্রেণীভুক্ত বনের গাছ কাটার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু খাগড়াছড়িতে নির্বিচারে বন কর্তন হয়। কোনো বাধা ছাড়া বন উজাড় হচ্ছে। বন বিভাগ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের নাকের ডগায় প্রতিনিয়ত বনের কাঠ পরিবহন করা হচ্ছে।’
বন বিভাগের নাড়াইছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, ‘চলতি মৌসুমে আমরা দুইটা গাড়ি জব্দ করেছি।’ তবে কাঠ পাচার বন্ধে কেন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাপক হারে তামাক চাষ হওয়ার কারণে বৃক্ষ নিধন রোধ করা যাচ্ছে না।’ তবে ঝুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বন উজাড়ের এই ধ্বংসযজ্ঞ শুধু পরিবেশের জন্য হুমকি নয়, এটি জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জনজীবনের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বন মাটি নির্মল রাখে, পানির উৎস সতেজ রাখে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করে। কিন্তু বন উজাড়ের ফলে পশু-পাখির আশ্রয়স্থল ধ্বংস হচ্ছে, জীবজগতের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ কর্মীরা বনের গাছ কর্তন রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

-পার্বত্য সময়