এবার পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি তুললো মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির ঘনিষ্ঠ ছাত্র সংগঠন আরাকান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। সোমবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা এ দাবি করে। নিজেদের ফেসবুকে বাংলা ও ইংরেজিতে দুটি আলাদা পোস্টের মাধ্যমে এ বিবৃতি প্রকাশ করে তারা।
বাংলাদেশের খাগড়াছড়িতে এক অষ্টম শ্রেণির মারমা কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ও পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তবে এ ঘটনার পর সবাইকে চমকে দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে তারা।
এই ঘটনায় তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে বলে দাবি করছে প্রশাসনসহ রাজনীতিবিদরা। একই সন্দেহ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। তবে আরাকান স্টুডেন্টস ইউনিয়নের দাবির পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এ ঘটনার সাথে আরাকান আর্মির যোগসাজোশ থাকতে পারে।
তারা বলছেন, এর আগে এ সংগঠন বা দেশের বাইরের কোনো সংগঠন এভাবে সরাসরি সেনা প্রত্যাহারের দাবি করেনি। অবশ্যই এর পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য আছে।
প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে তারা ঘটনাটিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ উদাহরণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে।
সংগঠনটি অভিযোগ করে, ধর্ষণের বিচার দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বর্বরোচিত দমন-পীড়ন চালিয়েছে। এ সময় গুলি চালানো হয়, অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে হামলা করা হয়। এতে অন্তত চারজন নিহত এবং দশজনের বেশি আহত হন বলে বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে।

বিবৃতিতে রাখাইন স্টেট স্টুডেন্ট ইউনিয়ন বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ধর্ষণের ঘটনায় অবিলম্বে দায়ীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা, পাহাড়ে সামরিক শাসনের অবসান ঘটানো, শিক্ষার্থী ও তরুণদের হুমকি-চাপের দায়ে কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা, ধর্ষণ মামলার বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে ৩০ দিনের মধ্যে নিরপেক্ষ শুনানি নিশ্চিত করা, নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করা, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে যারা সহিংসতা চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, পাহাড়ের সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে সংলাপ আয়োজন করা ও খাগড়াছড়িতে জারি করা ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করা।
সংগঠনটি জাতিসংঘ ঘোষিত Indigenous Peoples’ Rights (UNDRIP) এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানায়। তারা অভিযোগ করে, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ সরকার এসব চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। ফলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকেই চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসে পাহাড়িদের ওপর দমননীতি চলে আসছে। এর উদাহরণ হিসেবে ১৯৯৬ সালে সেনাসদস্য কর্তৃক পাহাড়ি নারী ধর্ষণ, ২০০৩ সালে মহালছড়িতে গ্রাম পোড়ানো এবং ২০১৪ সালে রাঙামাটির ঘটনা তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির দাবি, পাহাড়ে নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা, ভূমি দখল, ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
রাখাইন স্টেট স্টুডেন্ট ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাহাড়ি জনগণের দুর্দশার প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, এ অঞ্চলে ধারাবাহিক দমন-পীড়ন বন্ধ না হলে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
শিক্ষক ও গবেষক মইনুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সময়ে আরাকান আর্মির সাথে আমাদের সেনাবাহিনী ও বিজিবির শীতল সম্পর্ক চলছে। রাখাইনে আরসা-আরএসও'র হামলা নিয়ে আরাকান আর্মি সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দিকে আঙুল তুলছে। এদিকে খাগড়াছড়ির ঘটনার মূল উসকানিদাতা ইউপিডিএফের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। এই সহিংসতার পেছনে আরকান আর্মির জড়িত- এই দাবিটি বেশ যৌক্তিক।
উল্লেখ্য, স্বতন্ত্র পরিচয়ে এই ছাত্র সংগঠনটি রাখাইনে স্বেচ্ছাসেবী হয়ে কাজ করলেও তাদের পেছনে আরাকান আর্মির সমর্থন আছে বলে জানা যায়। এছাড়া তারা আরাকান আর্মি বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকে।


