দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার করা ক্যাম্পগুলোসহ মোট ২৫০টি ক্যাম্প পুনঃস্থাপন এবং পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুনর্মূল্যায়নের জোর দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সংগঠন এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন।
একই সঙ্গে, সংগঠনটি ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, ইয়েন ইয়েন, প্রসীত বিকাশ খীসা, নাথান বম ও সন্তু লারমাসহ বেশ কয়েকজন আঞ্চলিক নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
রোববার (২ নভেম্বর ২০২৫) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘অশান্ত পাহাড় সার্বভৌমত্বের হুমকি! জাতীয় নিরাপত্তায় করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের প্রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান সাইফ (অব.)। তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়ের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন খাত থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম অশান্ত হওয়ার পেছনে ১০টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সেনাবাহিনীর ২০০টির বেশি ক্যাম্প প্রত্যাহার, পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম ও পারস্পরিক আধিপত্যের লড়াই, পার্শ্ববর্তী দেশের প্ররোচনা ও মদদ, বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা, বাঙালিদের অধিকারের অবমূল্যায়ন এবং উপজাতি নেতাদের সঙ্গে বিদেশি এনজিও ও কূটনীতিকদের গোপন যোগাযোগ।
লেফটেন্যান্ট সাইফুল্লাহ খান (অব.) আন্তঃকোন্দলের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে বলেন, শুধু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে ৯৬টি সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়েছে। এই এক বছরে তাদের আন্তঃকোন্দলে ৩৭ জন নিহত হয়েছে এবং ২১ হাজার রাউন্ডেরও বেশি গুলি বিনিময় হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ৪১টি খাত থেকে চাঁদাবাজি করছে এবং বছরে ১২০ থেকে ১৫০ জন মানুষকে অপহরণ ও গুম করা হচ্ছে।
সেমিনারে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রোকন উদ্দিন (অব.) পার্বত্য চট্টগ্রামকে 'বিষফোড়া' হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, "পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, এটি তৈরি করেছে ভারত। তারা কখনোই আমাদের বন্ধু ছিল না। প্রতিটি সরকারকে চাপে রাখার জন্য তারা পাহাড়ে এসব সমস্যার সৃষ্টি করেছে।"
সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক থোয়াই চিং মং শাক বলেন, ‘আমাদের এই পাহাড়ে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর ভাইয়েরা যেমন শহীদ হন, আবার একইভাবে বাংলাদেশের নাগরিক বাঙালি, অবাঙালিরাও শহীদ হন। আমরা কেন সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছি, এই রাষ্ট্র কী করেছে এত বছর?’
পাহাড়ে নিরাপত্তার জন্য সেনা ক্যাম্প বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে থোয়াই চিং মং শাক বলেন, ‘আমাদের দাবি দুটি দাবি হচ্ছে ১৯০০ সালে পাহাড় নিয়ে করা ব্রিটিশ আইন বাতিল করতে হবে। কারণ, পাহাড়ে বাঙালি ও অবাঙালিদের ভেতর দ্বন্ধ-সংঘাত, অবিশ্বাস তৈরির জন্য দায়ী এই আইন। দ্বিতীয়ত ১৯৮৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিষদ যে আইন রয়েছে, এই আইনকেও বাতিল করতে হবে। কারণ, এই আইনের মাধ্যমে আমরা এখনো বিভাজিত হয়ে আছি।’ উপজাতি, আদিবাসী, সেটেলার ইত্যাদি শব্দগুলো বাদ দিয়ে বাঙালি, অবাঙালি বলার আহ্বান জানান সিএইচটি সম্প্রীতি জোটের আহ্বায়ক থোয়াই চিং মং শাক।
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, "সরকারের কাছে জোর দাবি, আমরা সেখানে শুধু ক্যাম্প নয়, স্থায়ীভাবে ক্যান্টনমেন্ট চাই। ভারতও তাদের প্রতিটি পার্বত্য অঞ্চলে সীমান্ত সুরক্ষায় সেনা ক্যান্টনমেন্ট রেখেছে। ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন ছাড়া পাহাড়ে শান্তি আসবে না।"
জনতার দলের মুখপাত্র ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ডেল এইচ খান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অস্থিরতা শুধু একটি স্থানীয় বা সামরিক সংকট নয়; এটি একটি জলজ্যান্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা। সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে বিদ্রোহ সাময়িকভাবে দমানো যায়, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের কারণগুলো মুছে ফেলা যায় না। ফলে সমস্যাগুলো বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের মহাসচিব মো. আলমগীর কবির এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতিকুল হক (অব.)।


