সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বাজার ফান্ড প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পাহাড়ে সরকারি চাকরিতে জাতিগত বৈষম্যের পুরোনো বিতর্ককে। বিজ্ঞপ্তিতে সুস্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে: “পরিষদের আইন মোতাবেক উপজাতীয় প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।” এই একটি বাক্য যেন রাষ্ট্রীয় চাকরির নিয়োগনীতিকে সাংবিধানিক ধারার বাইরে নিয়ে গিয়ে এক নতুন বৈষম্যের বৈধতা দেয়।
প্রথমেই বলা দরকার, সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বা জন্মস্থানভেদে কাউকে চাকরি, শিক্ষা বা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না- এমনটা সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় এই নীতিমালা কতটা মানা হচ্ছে?
পার্বত্য চুক্তি ও স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর যুক্তিতে অনেক সময় বলা হয়, পাহাড়িদের ‘ঐতিহাসিক পশ্চাৎপদতা’র কারণে তাদের জন্য কিছু সংরক্ষণ থাকা উচিত। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সংরক্ষণ কখনোই বাকি জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার হতে পারে না। অথচ এখন তা-ই দেখা যাচ্ছে। চাকরির আবেদন করতে চাওয়াও যেন বাঙালিদের ‘অপরাধ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই বলে দেওয়া হচ্ছে-এই পদ উপজাতীয়দের জন্য!
এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি তুলে ধরছে বৃহৎ একটি রাষ্ট্রীয় সংকট- পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা কি আর সমান নাগরিক? আজও কি তারা পুরোপুরি এই রাষ্ট্রের অংশ? রাষ্ট্রের সংবিধান এক, কিন্তু পাহাড়ে যেন চলছে এক আলাদা নীতি।
এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পরিষদের বাঙালি সদস্যদের ভূমিকা। তাদের অনেকেই ক্ষমতায় আছেন, প্রশাসনে প্রভাবশালী, কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা নির্লিপ্ত। তাদের নীরবতা অনেক সময় রাজনৈতিক সুবিধাবাদ বা আত্মরক্ষার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই নীরবতা নিজ জনগোষ্ঠীর প্রতি চরম অন্যায়।
পার্বত্য তিন জেলায় আজ বাঙালিরা শুধু চাকরি নয়, ভূমি অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, এমনকি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দিক থেকেও প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। এই বৈষম্য এখন আর কেবল পাহাড়িদের ‘অগ্রাধিকার’ নয়, বরং ‘বাঙালিদের বাদ’ নীতিতে রূপ নিয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে এনজিও, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এমনকি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও বাঙালি অংশগ্রহণ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির নামে কি একটি বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে? রাষ্ট্র যখন কিছু নাগরিককে অন্য নাগরিকের চেয়ে ‘বিশেষ’ মর্যাদা দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রই তো তার নিজস্ব সাম্যনীতি ভেঙে ফেলে। এভাবে দীর্ঘদিন চললে এক সময় ‘বিচ্ছিন্নতা’র বীজ তৈরি হয়, যেটি কখনও রাজনৈতিক দাবিতে, কখনও নিরাপত্তা সংকটে, আবার কখনও জনতার ক্ষোভে বিস্ফোরিত হয়।
অন্যদিকে, পাহাড়ি নেতৃত্ব ও এনজিও সেক্টর প্রায়শই আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ তোলে, পার্বত্য অঞ্চলে তারা নাকি ‘বঞ্চনার শিকার’। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই অঞ্চলেই জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে সবচেয়ে সংগঠিত ও কাঠামোগত বৈষম্যের চর্চা চলে আসছে। এ চর্চার শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাঙালিরা- যারা নিজের জমিতে বসবাস করেও ভূমি রেকর্ড পায় না, নিজের জন্মস্থানেই চাকরির ফর্ম জমা দিতে গিয়ে শুনতে পায়: “আপনি উপজাতীয় নন, আবেদন করতে পারবেন না।”
এই অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। রাষ্ট্রকে তার সংবিধান অনুসারে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ের স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদেরও জোরালোভাবে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজকে এই প্রশ্ন তুলতে হবে- রাষ্ট্র কি আর রাষ্ট্র আছে, যদি সে নিজেই নিজের নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে?
সবশেষে বলি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অংশ, এবং সেখানে বসবাসকারী বাঙালিরাও বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের অধিকারও সমানভাবে সংবিধানপ্রদত্ত। পাহাড়ে শান্তি চাইলে আগে চাই ন্যায়বিচার। আর ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত- সকলের জন্য সমান সুযোগ।
-রিয়াজুল ইসলাম, সাংবাদিক


