পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আবারও এক জটিল সঙ্কটে দাঁড়িয়ে। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির পর থেকে বারবার আশার আলো জ্বালানো হলেও, বাস্তবতা হচ্ছে— পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি, বরং নতুন রূপে পুরোনো সংঘাতের আগুন জ্বলছে। সম্প্রতি খাগড়াছড়ি ও আশপাশের এলাকায় সহিংস আন্দোলনের ঘটনাই এর সর্বশেষ প্রমাণ। এই আন্দোলনের নেপথ্যে শুধু কোনো ধর্ষণ মামলা নয়, বরং বহুমাত্রিক স্বার্থান্বেষী শক্তির সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। অনুসন্ধান ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের বক্তব্যে স্পষ্ট হচ্ছে, কমপক্ষে চারটি শক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার খেলায় যুক্ত। এই চার পক্ষের ভূমিকা, উদ্দেশ্য ও কৌশল পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায় পাহাড় আজ কত বড় এক ষড়যন্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে।
১. ইউপিডিএফ: পুরোনো কৌশল, নতুন মুখোশ
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) জন্মলগ্ন থেকেই শান্তিচুক্তিবিরোধী সংগঠন। তাদের পুরোনো কৌশল হলো— একটি নির্দিষ্ট অপরাধ বা ঘটনা (যেমন ধর্ষণ, হত্যা, নিখোঁজ ইত্যাদি)কে কেন্দ্র করে সেনা-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া। সাম্প্রতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’ ব্যানার ব্যবহার করে আন্দোলন শুরু হলেও পরে জানা যায় এর নেপথ্যে রয়েছে ইউপিডিএফ। পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনকারীরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন, তারা সকলে ইউপিডিএফের কর্মী।
মারমা সম্প্রদায়ের বৃহৎ দুটি সংগঠন—বাংলাদেশ মারমা ঐক্য পরিষদ ও মারমা উন্নয়ন সংসদ—যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, শান্তিপ্রিয় মারমা জনগণ এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। তাদের মতে, ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা ব্যানারের আড়ালে বিশেষ মহল পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউপিডিএফ ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা পাচ্ছে। দিল্লি-ভিত্তিক কিছু মহল পাহাড়কে অশান্ত রেখে বাংলাদেশকে চাপের মুখে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে ইউপিডিএফের রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে মিলে গেছে।
খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ভারত ও ফ্যাসিস্টদের ইন্ধনে ঘটছে। প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘে অবস্থানকালে ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারত থেকে লাগাতার নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে।
২. দেবাশীষ চাকমা ও ইয়ান ইয়ানের রাজনৈতিক এজেন্ডা
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দেবাশীষ চাকমা ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়ান ইয়ান দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় আছেন। ইয়ান ইয়ান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিজেকে উপজাতিদের কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। বাস্তবে তিনি প্রায়ই অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তাদের লক্ষ্য হলো— পাহাড়কে অস্থিতিশীল রেখে নিজস্ব আধিপত্য টিকিয়ে রাখা। সম্প্রতি ১৯০০ সালের বিধি বাতিলের দাবি উঠেছে। এই বিধি বাতিল হলে চাকমা সার্কেল চিফ বা রাজা পদ বিলুপ্ত হবে। দেবাশীষের রাজার মর্যাদা ও ক্ষমতা তখন সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে। তাই স্বার্থরক্ষার জন্য তারা পাহাড়ের সংকটকে ব্যবহার করছেন।
এদের পেছনে রয়েছে দেশের তথাকথিত সুশীল শ্রেণি, যারা মূলত বিদেশি অর্থায়ননির্ভর এনজিও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সক্রিয়। দিল্লি-ভিত্তিক মহলের প্রভাবে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে 'উপজাতিরা বঞ্চিত' এমন ন্যারেটিভ প্রচার করছে। এর মাধ্যমে যেমন বিদেশি দাতাদের কাছে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা টিকিয়ে রাখতে দেশীয় জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
৩. আরাকান আর্মি: চোরাচালান ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে উপজাতি শক্তির সাথে সন্ধি
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইনে আরাকান আর্মির শক্ত অবস্থান এখন নতুন উদ্বেগের কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে।
কারণ স্পষ্ট— বিজিবি সীমান্তে টহল জোরদার করায় অস্ত্র-মাদকসহ অন্যান্য চোরাচালান বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আরাকান আর্মির অর্থের যোগানে ভাটা পড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অস্থিতিশীল হলে এই চোরাচালান আবার সহজ হবে। পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর অবস্থান আরাকান আর্মির জন্য নিরাপদ অনুপ্রবেশ ও সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তাই তারা সরাসরি পাহাড় থেকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি তুলছে। তাদের সহযোগী সংগঠন আরাকান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই ইউপিডিএফের দাবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায় এমন বিবৃতি দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, ইউপিডিএফ ও আরাকান আর্মির মধ্যে সমন্বয় বাড়ছে। গত ১৬ ও ১৭ এপ্রিল বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের রেমাক্রি মুখ এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার প্রবেশ করে ইউনিফর্ম ও অস্ত্রধারী আরাকান আর্মির সদস্যরা ইউপিডিএফের সহযোগিতায় জলকেলি উৎসব পালন করেছে। সব মিলিয়ে এ যুক্তি যথেষ্ট শক্তিশালী যে, সাম্প্রতিক সহিংসতায় আরাকান আর্মির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
৪. প্রবাসী উপজাতি এক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক
চতুর্থ বড় শক্তি হলো প্রবাসী উপজাতি এক্টিভিস্টদের একটি অংশ। এর মধ্যে রয়েছেন— সুহাস চাকমা, প্রজ্ঞা তাপস চাকমা, পূর্ণ লাল চাকমা, সঞ্চয় চাকমা, অরুণ চাকমা প্রমুখ। এরা সবাই বিদেশে বসে পাহাড়ে উসকানি ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত। তারা The Global Association for Indigenous Peoples of the Chittagong Hill Tracts (GAIPCHT) নামে একটি কথিত এনজিও সংস্থা পরিচালনা করছে। এই সংগঠন ভারতের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। পূর্ণ লাল চাকমা তো সরাসরি ইসরায়েলের প্রভাবশালী গণমাধ্যম Times of Israel-এ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিবন্ধ লিখছেন। অর্থাৎ তাদের আন্তর্জাতিক লবিংও চলছে। তাদের কৌশল হলো— পাহাড়কে অশান্ত রেখে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং বিদেশি ফান্ড সংগ্রহ করা।
এই চারটি শক্তি আলাদা হলেও লক্ষ্য একই— পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখা। ইউপিডিএফ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, দেবাশীষ-ইয়ান ইয়ান নিজেদের রাজকীয় আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছেন, আরাকান আর্মি চোরাচালানের স্বার্থে ও সীমান্তে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে, আর প্রবাসী উপজাতি এক্টিভিস্টরা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। এই বহুমুখী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপে সীমিত রাখা যাবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য, আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃঢ় কূটনীতি এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— পাহাড়ি-বাঙালি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদার করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একে বিচ্ছিন্ন করার যে কোনো প্রচেষ্টা দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। তাই সরকারকে এখনই কঠোর কিন্তু কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে চার দিক থেকে চলা এই বহুমুখী ষড়যন্ত্র সফল হতে না পারে।
লেখক- গোলাম যাকারিয়া
সাংবাদিক ও কলামিস্ট


