বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি উপেক্ষা করে বসতি স্থাপন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জেলা সদরের পাশাপাশি সাতটি উপজেলায় বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন। এর মধ্যে বান্দরবান ও লামা পৌর এলাকার অন্তত ১৫ হাজার মানুষ বসবাস করছেন ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেখা গেছে, বান্দরবান পৌরসভার বনরূপা পাড়া, কালাঘাটা, বাহাদুরনগর, তুমব্রু পাড়া, লেমুঝিড়ি, বালাঘাটা ফজর আলী পাড়া এবং স্বর্ণমন্দির সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। রাতের আঁধারে স্কেভেটরের মাধ্যমে, এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও শ্রমিক দিয়ে পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণের কাজ চলেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত বান্দরবানে পাহাড় ধসে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৮৫ জন। শুধু ২০১২ সালেই লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের। ২০১৭ সালের ১৩ জুন কালাঘাটায় একদিনেই মৃত্যু হয় ৭ জনের। এছাড়া ২০২১ সালে রোয়াংছড়ির সাইঙ্গ্যা ঝিড়িতে একই পরিবারের তিনজন এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালের বর্ষা মৌসুমেও বান্দরবান সদর, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন।
বান্দরবান মৃত্তিকা গবেষণা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহাবুবুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, “পাহাড় ধসে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি। নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় কাটার কারণে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই পাহাড় ধস এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং পরিবেশগত বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিপর্যয় রোধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় বসতি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”
জেলা প্রশাসক শামীম আরা নীনা বলেন, “বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোর বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার জন্য নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। যারা পাহাড় কেটে বসতি গড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জেল-জরিমানা করা হচ্ছে।”
তবে স্থানীয়রা বলছেন, একবার জরিমানা করার পর কিছুদিন পাহাড় কাটা বন্ধ থাকলেও পরে আবার তা শুরু হয়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া কিংবা প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার কারণেও অনেক সময় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না।
প্রতিবছর বর্ষা এলেই পাহাড় ধসের শঙ্কায় কাঁপে বান্দরবানের বাসিন্দারা। প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকদিনের অভিযান হয়, কিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়, তারপর আবার পুরনো চিত্র ফিরে আসে। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বহুপাক্ষিক সমন্বয় এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।
-পার্বত্য সময়


