ভারতের কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সবসময়ই সুপরিকল্পিত এবং সুদূরপ্রসারী। সাম্প্রতিক সময়ে এমন অভিযোগ উঠেছে যে, ভারত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুনরায় অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়। এই অভিযোগের পেছনে ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যা ভারতের সম্ভাব্য লাভের দিকগুলোকে উন্মোচিত করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত। এটি ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মিয়ানমারের সাথে সীমানা ভাগ করে। এই অঞ্চলে অশান্তি বিরাজ করলে বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা দুর্বল হতে পারে, যা ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা সৃষ্টি করে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ভারতের জন্য সীমান্তে তার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়, ফলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখা সম্ভব হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যারা ঐতিহ্যগতভাবে বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ত্রিপুরায় বসবাসরত চাকমা নেতারা দাবি করেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং ১৯৪৭ সালে এটি পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর একটি ঐতিহাসিক ভুল ছিল। এই ধরনের দাবি ভারতের জন্য সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়।
প্রায়ই দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অস্ত্র ও গুলিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে যে, ভারত থেকে অস্ত্রের চালান এই অঞ্চলে প্রবেশ করছে। এই ভূখন্ডে সন্ত্রাস কার্যক্রম শেষে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছ- এরকম নজির অগণিত। আবার কেউ কেউ ভারতে বসেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা সৃষ্টির সবরকম ব্যবস্থা করছে। এসব কার্যকলাপ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সরকারের মনোযোগ উন্নয়নমূলক কাজ থেকে সরিয়ে নেয়। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায় এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যে ভারতের অবস্থান মজবুত করে।
ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষ করে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি থাকলে, ভারত এই অঞ্চলকে একটি 'বাফার জোন' হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা চীনের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে সক্ষম।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এই অঞ্চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আশ্রয় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি। ফলে ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগ্রহী ও সচেষ্ট হতে হবে, যাতে তার নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি ভারতের জন্য কৌশলগত, রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করতে পারে। তবে, এই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সংকট এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ। তাই, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা উচিত, যাতে সকল দেশের স্বার্থ রক্ষা পায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্তি শুধুমাত্র বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতের জন্যও গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ, যা 'সেভেন সিস্টার্স' নামে পরিচিত, তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এই অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াবে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চোরাচালান, মাদক পাচার এবং অস্ত্র বাণিজ্যের মতো অবৈধ কার্যক্রমের প্রসার ঘটাতে পারে। ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাত বাড়লে সেখান থেকে শরণার্থীরা ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম ও আসাম রাজ্যে আশ্রয় নিতে পারে, যা তাদের স্থানীয় সম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
ভারত ও বাংলাদেশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। এতে সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারে, যা স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নত করবে এবং অস্থিরতা কমাবে। বাংলাদেশ আশা করে যে ভারত তাদের সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করবে, যাতে সন্ত্রাসী ও চোরাচালানকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে না পারে। বাংলাদেশ চায় ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করুক।
সার্বিকভাবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা ভারত ও বাংলাদেশের উভয়ের স্বার্থে। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
-রিয়াজুল ইসলাম, গণমাধ্যমকর্মী


