সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মনগড়া ও একপেশে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিকভাবে তৈরি করা এ প্রতিবেদনে ‘ধর্মান্তরণ’, ‘ভূমি দখল’, ‘গ্রেপ্তার’ ইত্যাদি অভিযোগ তোলা হলেও এর অধিকাংশই যাচাই-বাছাইবিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সূত্র বলছে, জেএসএস যেসব ঘটনাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলছে, সেগুলোর সিংহভাগই আসলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, অপহরণ বা অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপ।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকে সামনে রেখে সরকার যখন একটি অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে, তখন জনসংহতি সমিতি এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং বিদেশি সহানুভূতি পেতে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ নামক বিতর্কিত বয়ান তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া জনমানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এ কারণে স্থানীয় জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে জেএসএস। ফলে, তারা এখন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সরকারবিরোধী একটি ‘ভিকটিম ন্যারেটিভ’ দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে।
জেএসএস দাবি করেছে, ৩০টি শিশুকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে প্রতিবেদনে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এমনকি স্থানীয় প্রশাসন বা ধর্মীয় সংস্থাগুলো এমন কোনো অভিযোগ গ্রহণ করেনি। তাছাড়া ভুক্তভোগী কোনো পরিবারের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এটি ‘মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের’ মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার বিপজ্জনক একটি উদাহরণ।
‘৩০০ একর ভূমি দখল’ হয়েছে বলে জেএসএস অভিযোগ করলেও বাস্তবে এগুলোর অনেক অংশই বন বিভাগের খাসজমি অথবা জেএসএস সমর্থিত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবৈধ দখলমুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ। এর ফলে পাহাড়ি-বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীই উপকৃত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে এই গ্রেপ্তারের পেছনের কারণ গোপন রাখা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং পাহাড়ি জনগণের ওপর নির্যাতনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এসব গ্রেপ্তারকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল দুর্বল করতেই নয়, বরং দেশে-বিদেশে ‘রাজনৈতিক নিপীড়নের’ একটি মিথ্যা প্রেক্ষাপট দাঁড় করানোর সুপরিকল্পিত অপপ্রয়াস।

জেএসএস দাবি করেছে, চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা বাস্তবায়ন হয়নি। বাস্তবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, জেলা পরিষদের ক্ষমতা হস্তান্তরসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ধারা ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন চক্রের বিভ্রান্তিমূলক আচরণ ও আঞ্চলিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই বারবার বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তির বাস্তবায়ন একটি প্রক্রিয়াগত বিষয়। সরকার বিষয়টি ধাপে ধাপে পূর্ণ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হলেও জেএসএস চাইছে তা ‘তাদের অনুকূলে’ একচেটিয়াভাবে বাস্তবায়িত হোক—যেখানে অন্য জাতিগোষ্ঠী ও বাঙালিদের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না।
সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় নীতি। কোনো দলের পক্ষ থেকে ভুল ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন দিয়ে রাষ্ট্রকে চাপে ফেলার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।”
জনসাধারণের নিরাপত্তা, সুশাসন এবং সমঅধিকারের স্বার্থেই পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও যুক্তিসঙ্গত। জেএসএসের একপেশে ও বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া প্রয়াস ছাড়া কিছু নয় বলেই স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরা।
-পার্বত্য সময়


