হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র, কোমরে গ্রেনেড, আর পিঠে গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রকাশ্য রণসাজে বান্দরবানের শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সদস্যরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অস্ত্র হাতে শহরে ঘোরাফেরা করেও এখন পর্যন্ত কোনো জেএসএস সদস্যকে গ্রেপ্তার বা অভিযান চালায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থানীয়দের দাবি—১৯৭৭ সালে বান্দরবানে সাঙ্গু নদীর তীরে পাঁচ সেনাসদস্য হত্যার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এই সংগঠনটি। এরপর গত চার দশকে সংগঠনটি প্রায় ৩৮ হাজার বাঙালিকে হত্যা করেছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে আসছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ই এপ্রিল, যখন বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায় জেএসএস’র ব্রাশফায়ারে ৮ জন নিহত হয়। সংগঠনটি এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৭টি গণহত্যা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।
কেএনএফ দুর্বল হতেই জেএসএস’র উত্থান
২০২৪ সালের এপ্রিলে রুমা ও থানচিতে সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতি, পুলিশের অস্ত্র লুট, মসজিদে হামলা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের অপহরণের পর কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু হয়। এতে সংগঠনটির প্রধান নাথান বম মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরামে পালিয়ে যান, এবং মাঠ পর্যায়ে সংগঠনটি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই শূন্যতার সুযোগে বান্দরবানে আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে জেএসএস। এক সময় জেলার সদর, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলিকদমে জেএসএস-এর একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও, কেএনএফ, ম্রো বাহিনী, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং মগ লিবারেশন আর্মির উত্থানে তা হ্রাস পেয়েছিল। এখন নতুন করে তারা অস্ত্র মহড়া, চাঁদাবাজি ও অপহরণে লিপ্ত হয়েছে বলে অভিযোগ।
চলতি বছরের ১৯ মার্চ রাঙামাটি-বান্দরবান সীমান্তবর্তী বড়থলীতে কেএনএফ ও জেএসএস’র মধ্যে সংঘর্ষ হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেএসএস সদস্যরা বর্তমানে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
২০১৬ ও ২০১৭ সালে মারমা জনগোষ্ঠী জেএসএস-এর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। এখন আবারো তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমছে সাধারণ জনগণের মধ্যে।
স্থানীয় সাংবাদিক মোহাম্মদ রফিক মানবজমিনকে বলেন, “জেএসএস’র সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করতে হলে সেনা ক্যাম্প বাড়াতে হবে এবং পাহাড়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে জেএসএস-এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।”
এই বিষয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) আব্দুল করিম বলেন, “আমাদের কাছে যদি কোনো অভিযোগ বা মামলা আসে, আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিই। সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বটে, তবে আমাদের জেলা এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।”
তবে পাহাড়ে যারা বসবাস করেন, তাদের চোখে দৃশ্যটা ভিন্ন। জেএসএস’র এমন প্রকাশ্য অস্ত্র মিছিল এবং চাঁদাবাজি স্থানীয়দের জীবনকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
-পার্বত্য সময়


