জুমের ধান পাকায় সোনালী রঙে রঙিন হয়েছে সেই চিরচেনা সবুজ পাহাড়। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় বিশাল বিশাল সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় জুমের সোনালী রঙের পাকা ধান। বান্দরবানের পাহাড়ে সেই জুমের ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পাড় করছে জুমিয়ারা। 
সরেজমিনে জানা যায়, এ বছর বৃষ্টি দেড়িতে হওয়ার কারণে জুমের ধান বপনে সময়ের ব্যবধান বেশী হওয়ার কারণে কোন কোন জুমের ধান এখনও সবুজ। আবার কোথাও ধান পেকে সোনালী রঙে রঙ্গিন হয়ে আছে। এমন জুমের ধান পাহারা দিতে জুম চাষীরা স্বপরিবারে জুম ক্ষেতে উঠেছেন। কেউ ধান কাটার আগে সাথী ফসল বিশেষ করে মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনাল সংগ্রহ করা শুরু করেছেন। অবার কেউ  জুমের পাকা ধান কাটার জন্য উপযুক্ত সময় অপেক্ষা করছেন। 
বিশেষ করে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দুর্গম এলাকায় এখন জুম চাষকে ঘিরে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে।  
চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে জুমের জায়গা নির্ধারণ করা হয়, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে জুম চাষের জন্য নির্ধারিত জায়গায় জঙ্গল কাটা হয়, তারপর কাটা জঙ্গল রোদে শুকানোর পরে মার্চ-এপ্রিল মাসে কাটা জঙ্গল আগুন দেওয়ার জন্য প্রথমে ফায়ারিং লাইন করে জঙ্গল পোড়ানো হয়, এপ্রিল মাস জুড়েই  জুমের জায়গা পরিস্কার করে ধান বপনের  জন্য প্রস্তুত করে কাঙ্খিত বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে, বৃষ্টি হলেই জুমের জায়গায় ধানসহ সাথীফসল বপন করা হয়। যারা বৈশাখ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর জুমে ধানসহ সাথীফসল বপন করতে পারেন তাদের ধান আগে পাকা শুরু করে আর যারা একটু দেরীতে বপন করেন তাদের ধান দেরীতেই পাকে। 
প্রতিবছর আগষ্ট মাসের শেষে অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে জুমের ধান কাটা শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বর - অক্টোবর পযর্ন্ত জুমের ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো প্রক্রিয়া চলে। ধান শুকানো শেষে জুমঘর থেকে মূলঘরে ধান স্থানান্তর করার পর ডিসেম্বর থেকে  ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত চলে ঘরে ঘরে জুম ধানের নবান্ন উৎসব।
স্থানীয় জুমচাষী মিলন ত্রিপুরা ও জুমচাষী পুষ্পরানী ত্রিপুরা জানান, এবছর জুম থেকে ২০০ আড়ি ধান পাওয়ার আশা করছেন। তবে যদি জুমের ধান ভালো হতো তাহলে ৩০০ আড়ি ধান পেতেন, তারপরও যা পাবেন এবছর জুমের ধানে কোনমতে বছর যাবে। এ বছর অনেকের জুমে ধান ভালো হয়নি। এছাড়া যা ভালো হয়েছিল ধান কাটার উপযুক্ত সময়ে টানা ৪-৫দিন বৃষ্টি হওয়াতে অনেক জুমচাষীর পাকা ধান নষ্ট হওয়ায় আগামীবছর খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে জানান। 
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বান্দরবান জেলায় বিগত ২০২১ সালে আবাদ হয়েছিল ৮ হাজার ৩ শত ৭৮ হেক্টর জায়গায় আর উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৪ শত ৬৭ দশমিক ২২ মেট্রিক্ট টন চাউল। পরে ২০২২ সালে আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ২ শত ৯২ হেক্টর জায়গায় আর  উৎপাদন হয়েছর ১১হাজার ৪ শত ১৮ দশমিক ১২ মেট্রিক টন চাউল। এছাড়া ২০২৩ সালে জুম চাষ আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৫ শত ৪০ হেক্টর জায়গায় আর উৎপাদন হয়েছে ১০ হাজার ৪ শত ৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিকটন চাউল, চলতি বছর ২০২৪ সালে জুম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৪ শত ৬০ হেক্টর জায়গায়, আবাদ অর্জনে ৮হাজার ২শত ৬৭ হেক্টর, আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০হাজার ৭১ মেট্রিক টন চাউল, বর্তমানে জুমের ধান কর্তন চলমান রয়েছে। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. হাসান আলী পার্বত্য সময়কে জানান, বান্দরবানে চলতি বছর প্রায় ৮হাজার তিনশত হেক্টর জায়গায় জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধান ছাড়াও সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে। এ বছর জুমের ফলন ভালো হবে আশা করা যায় তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ার কারণে সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না। যার কারণে উৎপাদনে তারতম্য হয়, একেক জায়গার ফলন একেক রকম হয়ে থাকে। 
তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে আর অন্যান্য উপজেলায়ও জুমের ধান কাটা শুরু হবে। জুমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষিবিভাগ বিভিন্ন পরামর্শ এবং স্থানীয় জাতের সাথে হাইব্রিড জাতীয় ধান উৎপাদন করার জন্য উৎসাহ ও পরামর্শ প্রদান করে থাকে।

-পার্বত্য সময়