খাগড়াছড়িতে এখন উঁকি দিচ্ছে উৎসবের রঙ। দুই দিন পর পাহাড়ের ঢালে ঢালে জ্বলে উঠবে হাজার প্রদীপ— প্রবারণা পূর্ণিমার সেই চেনা আলোকরাত্রি ফিরবে আপন মহিমায়। আলোর এই উৎসবের পাশাপাশি নিভৃতে বোনা হচ্ছে কঠিন চীবর— ভক্তি, ত্যাগ ও শ্রমে গড়া এক পবিত্র বস্ত্র, যা পরম শ্রদ্ধায় দান করা হবে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের। পূর্ণিমার আলো আর চীবর দানের এই মিলনেই যেন পাহাড় জেগে ওঠে ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার প্রতীকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এটি বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কেউ বলেন ‘বৌদ্ধদের বর্ষাবাসের অবসান উৎসব’, আবার কারও কাছে এটি আত্মশুদ্ধি ও পুণ্য অর্জনের দিন। প্রবারণার আগে তিন মাস বর্ষাবাস পালন করেন ভিক্ষুরা— আশ্রমে অবস্থান করে ধ্যান, পাঠ ও অনুশীলনে সময় কাটান। পূর্ণিমার এই দিনে সেই বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।
এই দিনটি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ। রাঙামাটি, বান্দরবান কিংবা খাগড়াছড়ি— সব জায়গাতেই প্রবারণার রাতটি ভিন্ন এক আবহে মোড়ানো থাকে। প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে প্রদীপ প্রজ্বালন, বুদ্ধপূজা ও পুণ্যদান কর্মসূচিতে মুখর থাকে মানুষ। বৌদ্ধ তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে হাতে প্রদীপ নিয়ে প্রার্থনা করেন— “সর্বত্র হোক শান্তি, মঙ্গল আর সহমর্মিতা।”
খাগড়াছড়ির য়ংড বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ক্ষেমাসারা থেরো বলেন, প্রবারণা শুধু আনন্দ নয়, আত্মসমালোচনার দিনও বটে। বর্ষাবাসে কেউ যদি কোনো ভুল করে থাকেন, এদিন তারা সেই ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। এই শিক্ষা শুধু ভিক্ষুদের নয়, সমাজেরও প্রয়োজন।
প্রবারণার পরদিন থেকেই মাসব্যাপী শুরু হয় কঠিন চীবর দান। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আয়োজন এটি।
‘চীবর’ অর্থাৎ ভিক্ষুর গেরুয়া বস্ত্রটি একদিনের মধ্যেই প্রস্তুত করতে হয়— তুলা থেকে বোনা, রঙ করা ও সেলাই করা পর্যন্ত সবকিছুই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। এরপর তা শ্রদ্ধাভরে দান করা হয় ভিক্ষু সংঘকে।
এই প্রক্রিয়ায় একাত্মতার অনন্য দৃষ্টান্ত দেখা যায়— নারীরা বোনেন, পুরুষেরা প্রস্তুতি নেন, তরুণরা সহায়তায় ব্যস্ত থাকেন। সব মিলিয়ে কঠিন চীবর দান যেন শ্রম, ভক্তি ও সহযোগিতার উৎসব। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই দানে অর্জিত পুণ্য অসীম ও অতুলনীয়।
চীবর দানের দিনগুলোতে পাহাড়ের গ্রামগুলো সাজে উৎসবের সাজে। ভোর থেকে নারীরা কাপড় বোনায় ব্যস্ত থাকেন, পুরুষরা মন্দিরে আলোসজ্জা করেন, শিশুরা হাতে প্রদীপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অন্য বছরের মতো এবারও খাগড়াছড়ির প্রতিটি বিহারে মাসব্যাপী আয়োজন করা হচ্ছে কঠিন চীবর দান উৎসব।
পূর্ণিমার আলোকরাত্রি আর পরদিনের চীবর দানের পবিত্রতা— এই দুইয়ের সমন্বয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন হয়ে ওঠে শান্তি, সহমর্মিতা ও ধর্মীয় ঐক্যের এক আলোকিত পর্ব।


