মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে দুর্যোগ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পাহাড় ধসের পাশাপাশি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। বিপদাপন্ন এলাকাগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বান্দরবানের লামা উপজেলায় সব পর্যটন রিসোর্ট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
রাঙামাটি: প্লাবিত নিম্নাঞ্চল, বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়ক
রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি এবং উজানের পাহাড়ি ঢলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৬৭২ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৩টি ঘরবাড়ি এবং অন্তত ৬৩ হেক্টর কৃষিজমি।
টানা বৃষ্টিতে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের মঘাছড়ি এলাকায় মাটি ধসের ঘটনা ঘটেছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে মাটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে জুরাছড়ি ও কাউখালীর দুটি অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি ও নানিয়ারচরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘর পানিতে ডুবে গেছে। প্রশাসনের কাছে এসব এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পূর্ণ তথ্য না থাকলেও শুধু সাপছড়ি ইউনিয়নেই প্রায় ২০০টি পরিবার পানিবন্দি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউএনও।
খাগড়াছড়ি: ৯৩ মিমি বৃষ্টিপাত, পাহাড় ধস ও সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন
খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। ভোরে ধুমনীঘাট এলাকায় ধসে মহালছড়ি–জালিয়াপাড়া সড়কে যান চলাচল কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। খাগড়াছড়ি সদরের ভূয়াছড়ি, গুগড়াছড়ি, ন্যান্সি বাজার, শালবন, হরিনাথপাড়া, কলাবাগানসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।
সদর উপজেলার শালবন এলাকার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ৫০০ জন, যাদের জন্য খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দীঘিনালায় মাইনী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় মেরুং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে এবং রাঙামাটি–লংগদু সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলায় ১২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে।
বান্দরবান: বন্ধ ৬০টি রিসোর্ট, বাড়ছে নদীর পানি
টানা বৃষ্টির কারণে বান্দরবানের লামা উপজেলায় ৬০টির বেশি পর্যটন রিসোর্ট সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। উপজেলা দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটির জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইউএনও মো. মঈন উদ্দিন জানান, রিসোর্টগুলোর বেশিরভাগই পাহাড়ি ঢালে হওয়ায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রিসোর্টগুলো বন্ধ থাকবে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বান্দরবানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার তিনটি বড় নদী—সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাকখালীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যদিও এখনো তা বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাতটি উপজেলায় ২২০টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং একটি ‘দুর্যোগকালীন জরুরি সেবা কমিটি’ গঠন করে ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক ও এনজিও প্রতিনিধিদের সমন্বয় করা হয়েছে।
-পার্বত্য সময়


