আষাঢ়ী থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা— টানা তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে পার্বত্য জনপদে এখন উৎসবের আমেজ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ‘প্রবারণা পূর্ণিমা’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে’ উদযাপিত হচ্ছে পাহাড়জুড়ে।
ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বুদ্ধ পূজা, ধ্যান ও শীল পালন, ফানুস উড়ানো এবং রথযাত্রা—সব মিলিয়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের প্রতিটি মারমা গ্রামে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

প্রবারণা উৎসব মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ষাবাস সমাপ্তির দিন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আত্মসংযম, শীল ও ধ্যানচর্চায় নিযুক্ত থাকেন। এরপর প্রবারণা পূর্ণিমা আসে তাদের আধ্যাত্মিক সাধনার পরিণতি হিসেবে—যেখানে ভিক্ষুরা একে অপরের কাছে ভুল স্বীকার করে আত্মশুদ্ধির প্রতিজ্ঞা করেন।
ভিক্ষুদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও এই সময় উপবাস ও ধর্মচর্চায় অংশ নেয়। এরপর পূর্ণিমার দিনে শুরু হয় উৎসব—বুদ্ধ পূজা, প্রার্থনা, প্রদীপ প্রজ্বলন ও ফানুস উত্তোলনের মাধ্যমে।
সোমবার (৬ অক্টোবর) ছিল প্রবারণার দ্বিতীয় দিন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই বান্দরবানের আকাশে উড়তে থাকে শত শত রঙ-বেরঙের ফানুস। শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই যোগ দেন এই আলো উৎসবে।
বৌদ্ধ ধর্মমতে, এই ফানুস উৎসর্গ করা হয় চুলামনি জাদিকে, অর্থাৎ বুদ্ধের ধাতু বা পবিত্র স্মৃতিকে। মারমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস—ফানুস উড়িয়ে অন্ধকার দূর করে মনের অশুভ শক্তিকে পরিশুদ্ধ করা যায়।
মঙ্গলবার প্রবারণার শেষ দিনে বান্দরবানে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা। এ বছর রথটি রাজহংসীর আদলে তৈরি করা হয়েছে—রথের উপর থাকবে বুদ্ধমূর্তি, যেখানে দায়ক-দায়িকারাসহ ভক্তরা মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

এই রথযাত্রায় একটি প্রতীকী রাক্ষসও থাকবে—যেখানে তরুণরা ঢুকে রাক্ষুসে বেশ ধারণ করবে। এর মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে বশে এনে ধ্বংস করার প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়। রাতভর শহর প্রদক্ষিণ শেষে রথটি সাঙ্গু নদীতে বিসর্জন দেওয়া হবে।
প্রবারণা শুধু ধর্মীয় নয়, এটি সামাজিক ঐক্যের উৎসবও। প্রতি বিহারে এখন সাজসজ্জা, প্রদীপ, ফুল আর ধর্মীয় সঙ্গীতে মুখরিত পরিবেশ। পাড়ায় পাড়ায় চলছে পিঠা তৈরির আয়োজন, শিশুদের খেলাধুলা ও নাচগানের অনুষ্ঠান।
বৌদ্ধ ভিক্ষু উঃ আরাথি ভিক্ষু বলেন, প্রবারণা মানে শুধু পূজা নয়—এটা আমাদের আত্মশুদ্ধির দিন, পারস্পরিক মিলনের দিন। তিন মাসের সংযম শেষে আমরা এই উৎসবের মাধ্যমে মনের শান্তি লাভ করি।
স্থানীয়রা বলেন, প্রবারণা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এই দিনটিতে সবাই নিজের গ্রামে ফিরে আসে, যেন এক বিশাল পারিবারিক পুনর্মিলন।
উৎসবকে ঘিরে প্রশাসন নিয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে সার্বিকভাবে পার্বত্য এলাকায় উৎসবমুখর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।
ধর্মীয় নেতাদের মতে, এই প্রবারণা শুধু এক ধর্মীয় আচার নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও সংস্কৃতির স্থিতিশীলতার প্রতীক।


