পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল নিজের মায়ের ভাষায় শিক্ষা লাভ করা। সরকারের পক্ষ থেকে প্রাক-প্রাথমিকে বই বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতায় সেই কার্যক্রম এখন প্রায় ‘মুখথুবড়ে’ পড়েছে। বিশেষ করে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, বইয়ের স্বল্পতা এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার অভাবে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
২০১৭ সাল থেকে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা- এই তিন ভাষায় প্রাক-প্রাথমিকে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ শুরু হয়। কিন্তু জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলামের মতে, বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষক থাকলেও ভাষা শিক্ষার জন্য কোনো 'প্রশিক্ষিত শিক্ষক' নেই। ফলে বই পৌঁছালেও শ্রেণিকক্ষে সেগুলো পড়ানোর মতো কেউ নেই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে অনেকগুলোরই নিজস্ব বর্ণমালা আছে, কিন্তু চর্চার অভাবে সেগুলো এখন বিলুপ্তির পথে।
বর্তমানে দেশে বাংলা ছাড়া ৩৯টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি ভাষাকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে 'রেংমিতচা' ভাষা, যা বর্তমানে মাত্র ৬ জন মানুষ ব্যবহার করছেন। তরুণ লেখক শ্রমণ চিংহ্লা মং-এর মতে, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে মারমা ভাষার মতো শক্তিশালী ভাষাও এখন হুমকির মুখে। এই শঙ্কা থেকে ক্যহ্লাচাই চৌধুরী ও মংসাউ মারমার মতো ব্যক্তিরা নিজস্ব উদ্যোগে ভাষা রক্ষার কাজ করে যাচ্ছেন।
সরকারি কার্যক্রমের স্থবিরতার সুযোগে পাহাড়ের তিন জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ মারমা উন্নয়ন সংসদের সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী জানান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির (কেয়াং) বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে শিশুদের নিজস্ব বর্ণমালায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। জেলা পরিষদগুলো এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারত বলে তিনি মনে করেন।
এই সংকটের মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয়দের আবেদনে সেখানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ভাষা শিখন কেন্দ্র’ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মারমা ও ত্রিপুরা শিশুরা ভাষা শেখার সুযোগ পাচ্ছে।
সংবাদমাধ্যম ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হয়- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন জানান, সংকট কাটাতে প্রতিটি স্কুলে অন্তত ৩ জন করে প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগের একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যে স্কুলে যে নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী বেশি, সেখানে সেই ভাষার শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই অচলাবস্থা কাটানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
-পার্বত্য সময়


