পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে একসময় ছবির মতো সারি সারি মাচাংঘর ছিল। বাঁশের খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এসব ঘর শুধু ভৌগোলিক অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে তৈরি হয়নি, বরং হয়ে উঠেছিল পাহাড়ি জীবনের প্রতীক ও সংস্কৃতির অংশ। তবে সময়ের সাথে সাথে আধুনিকতার প্রভাব, জীবিকা পরিবর্তন এবং নির্মাণ উপকরণের সহজলভ্যতায় এখন পাহাড়ি বাসস্থানেও এসেছে নতুন ধারা।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বমসহ ১১টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিটি মাচাংঘরের নকশা ছিল স্বতন্ত্র। কিন্তু আজ শহর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাচাংঘর প্রায় বিলীন। তার বদলে টিনশেড ও আধা-পাকা ঘরের ব্যবহার বাড়ছে। জুমচাষি গ্রামগুলোতে এখনো কিছু মাচাংঘর টিকে আছে, যা স্থানীয় ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে আছে।
গবেষকদের মতে, জুমচাষের জীবনধারার সঙ্গে মাচাংঘরের সম্পর্ক একসময় অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। তবে বর্তমানে পাহাড়ের মানুষ নতুন প্রজন্মের চাহিদা ও আধুনিক নির্মাণ সামগ্রীর সুবিধা বিবেচনায় বসতবাড়ির ধরণ বদলে নিচ্ছে। ফলে পাহাড়ি জীবনধারায়ও আসছে পরিবর্তন।
শুধু মাচাংঘরই নয়, পাহাড়ি সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানও আধুনিকতার ছোঁয়ায় রূপ বদলাচ্ছে। উৎসবে বাঁশের তৈরি বাদ্যযন্ত্রের জায়গা নিচ্ছে ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সাথে যুক্ত হচ্ছে সমসাময়িক ফ্যাশন, আর বিয়ে-শাদির আচার-অনুষ্ঠানেও ঢুকে পড়ছে সমতলের ধাঁচ।
খাদ্যাভ্যাসেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় বনজ শাকপাতা, ঝিরির মাছ আর জুমচাষের ফসল ছিল প্রধান খাবার, এখন বাজারনির্ভরতা ও তরুণ প্রজন্মের রুচিতে ফাস্টফুডের প্রভাব স্পষ্ট।
সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আধুনিকতা পাহাড়ি সমাজে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ঐতিহ্যগত উপাদান কিছুটা বদলালেও তা সাংস্কৃতিক বিবর্তনেরই অংশ। তাদের মতে, এই পরিবর্তনকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়, বরং গবেষণা ও সংরক্ষণের মাধ্যমে পাহাড়ি ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

-পার্বত্য সময়