বাংলাদেশের সংবিধানকে প্রকাশ্যে উপহাস করে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার সম্প্রতি এক বিতর্কিত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে তীব্র জনরোষের জন্ম দিয়েছেন।
৯ এপ্রিল ২০২৫, রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে চারদিনব্যাপী ‘বিজু’ উৎসবের উদ্বোধনী আয়োজনে ‘আদিবাসী’ শব্দের ছড়াছড়ি থাকা ব্যানার, ফেস্টুন ও বক্তব্যে উপস্থিত থেকে তিনি শুধু সাংবিধানিক শপথকেই অপমান করেননি, বরং নিজের অবস্থান থেকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার সংবিধান লঙ্ঘন
বাংলাদেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দেশে ‘আদিবাসী’ নামে কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকৃত নয়। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও অনান্য সম্প্রদায়’ কথাগুলো থাকলেও ‘আদিবাসী’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তিতেও এই শব্দটিকে একবারের জন্যও স্থান দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থায় একজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান, যিনি সংবিধান রক্ষা ও মেনে চলার শপথ নিয়েছেন, তিনিই সংবিধানবিরোধী একটি শব্দ ও চেতনার অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। জনমনে প্রশ্ন, তাহলে সেটিকে কি ‘অনবধানতা’ বলা যাবে, নাকি সচেতন রাষ্ট্রবিরোধিতা?
বিজুর নামে আদিবাসী রাষ্ট্র গঠনের ডাক?
উক্ত অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত ফেস্টুনে স্লোগান ছিল:
“আদিবাসী জুম্ম জাতির অস্তিত্ব নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে অধিকতর সামিল হও।”
এই ধরনের স্লোগান কি নিছক সাংস্কৃতিক উৎসবের ভাষা? নাকি এটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণা যা জাতিগত বিভাজনের বীজ বুনে দেয়?
সচেতন মহল বলছেন, এই প্রোগ্রামের নাম যাই হোক না কেন, এর অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল এক ধরনের ‘সফট বিচ্ছিন্নতাবাদ’—যা সরাসরি জাতীয় ঐক্য, সংবিধান এবং আইনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নামান্তর।
কেন প্রশ্নবিদ্ধ কাজল তালুকদার?
জেলা পরিষদের চেয়ার একটি রাষ্ট্রীয় পদ। সেই পদে থেকে কোনো ব্যক্তি সংবিধানবিরোধী কার্যক্রমে অংশ নিলে, তা কি কেবল অনৈতিকতা, না কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা? কাজল তালুকদার একজন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়েও, রাষ্ট্রের মূলনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একটি প্রোগ্রামে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেটিকে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই ধরনের কাজ কোনো ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ নয়—এটি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষ ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাঙালি সংগঠন ও সাধারণ জনগণের তীব্র ক্ষোভ
এই ঘটনার প্রতিবাদে বাঙালি অধিকারকামী সংগঠনগুলো এবং পাহাড়ের সচেতন সাধারণ মানুষ সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। তাদের প্রশ্ন—“এ দেশের সংবিধান যদি বলে পাহাড়ে আদিবাসী নেই, তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে এই ধারণার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন?”
একজন নেটিজেন লিখেছেন, “সংবিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কাজল তালুকদার প্রমাণ করেছেন, তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে নন, রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীর পক্ষে।”
সরকারের নীরবতা কি মদদদানের শামিল?
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট বিবৃতি না আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। যদি সংবিধানকে কার্যকরভাবে রক্ষা করতে হয়, তবে এরকম ঘটনা উপেক্ষা করলে চলবে না।
রাষ্ট্রীয় পদে থেকে সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অপরাধে কাজল তালুকদারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে দ্বিধা তৈরি করা কিংবা সাংবিধানিক পরিচয়কে গুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা যদি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার মাধ্যমেই হয়—তাহলে সেটা শুধু একটি অপরাধ নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি একটি সরাসরি হুমকি।
সর্বোচ্চ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হলে, সংবিধানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো, এই নীরবতা ভবিষ্যতে পাহাড়ে আরেকটি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’-এর জন্ম দেবে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুরো দেশের মূল্য দিতে হতে পারে বলেও মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
-পার্বত্য সময়


