খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া তথ্যের বন্যা বইছে। এসব গুজব শনাক্ত করেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাফ্যাক্ট’।

বাংলাফ্যাক্ট জানায়, খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও সেটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব গুজব পাহাড়ে আরও অস্থিরতা বাড়াতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছে।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১০টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভিডিও এবং দুটি ছবি অন্য দেশ বা পুরোনো ঘটনার হলেও খাগড়াছড়ির উত্তেজনার সঙ্গে মিশিয়ে ছড়ানো হচ্ছে।

গুজব ১
খাগড়াছড়িতে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে-খাগড়াছড়িতে রাতে গোলাগুলি হয়েছে। আওয়ামী সংশ্লিষ্ট কিছু পেইজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি প্রচার করা হয়।

যদিও ভিডিওটি খাগড়াছড়ির নয়। এটি আসলে ইন্দোনেশিয়ার। গত আগস্টের শেষের দিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়।

আলোচিত ভিডিওটি সেই সময়কার ঘটনার দৃশ্য।

গুজব ২
পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন খাগড়াছড়ি মডেল মসজিদে আগুন দিয়েছে, এমন দাবি সম্বলিত একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এটিও খাগড়াছড়ির কোন ঘটনার নয়, দিনাজপুরের। গত ২৮ আগস্ট জেলা শহরের ‘জীবন মহল’ নামের বিনোদন রিসোর্টে তৌহিদী জনতা বিক্ষোভ করে। ওই সময় বিক্ষুব্ধরা রিসোর্টের বিভিন্ন কাঠামোয় আগুন লাগায়। প্রচারিত ভিডিওটি সেই ঘটনার।

বাংলাফ্যাক্ট নিশ্চিত করেছে, খাগড়াছড়ি মডেল মসজিদে আগুন দেওয়ার তথ্যটি মিথ্যা।

গুজব ৩
ফেসবুকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের ওপর হামলার একটি ছবি সম্প্রতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এটিকে খাগড়াছড়ির সাম্প্রতিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত করছেন।

কিন্তু ছবিটি সাম্প্রতিক কোন ঘটনার নয়। এটি ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। সেদিন খাগড়াছড়ির পানছড়িতে বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে অভিযানে জব্দ টাকাসহ আটক দুই ব্যক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় স্থানীয়রা।

গুজব ৪
ফেসবুকে একটি ছবি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনীর সামনে সেটেলার বাঙালিরা প্রকাশ্যে জুম্মাদের ওপর গুলি বর্ষণ করছে।

কিন্তু সেটি খাগড়াছড়ির ঘটনার নয়। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী লীগ সমর্থিত অস্ত্রধারীর হামলার ছবি।

গুজব ৫
খাগড়াছড়িতে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বিজিবি ক্যাম্পে আগুন দিয়ে পাহাড়িরা অস্ত্র লুট করে উল্লাস করছে। এমন দাবি সম্বলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

তবে ভিডিওটিও নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর। জিওলোকেশন বিশ্লেষণ করে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বাংলাফ্যাক্ট।

গুজব ৬
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের অঙ্গরাজ্য বানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাংলাফ্যাক্ট যাচাই করে দেখেছে, ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়, ভারতের ত্রিপুরার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ত্রিপুরা রাজ্যে এ দাবিতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। এটি সেই সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যের ভিডিও।

গুজব ৭
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপর একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনী ও বিজিবির ওপর পাহাড়িদের হামলা চালানো ও অস্ত্র লুটের দৃশ্য বলে।

যদিও সেটি সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে সংঘটিত জেনজি বিক্ষোভের ভিডিও। জিওলোকেশন বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভিডিওটি দেশটির গৌশালা এলাকার পুলিশ সার্কেলে ধারণ করা।

গুজব ৮
খাগড়াছড়িতে মুখে রঙ মেখে এক চাকমা যুবক আহত হওয়ার অভিনয় করছে, এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

বাংলাফ্যাক্ট যাচাই করে দেখেছে, ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়। এটি মূলত ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কালসেং সাংমা তৈরি করেছেন এবং ১৮ জুলাই তার ইন্সটাগ্রাম হ্যান্ডেলে সেটি প্রকাশিত হয়।

গুজব ৯
খাগড়াছড়িতে আদিবাসীরা সেনাবাহিনীর সদস্যকে ধরে নিয়ে মারধর করছে, এমন দাবি সম্বলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এটি ২২ জুলাই ঢাকায় সচিবালয়ের সামনে সেনাবাহিনীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনার।

গুজব ১০
সেনাবাহিনী পাহাড়ি আদিবাসীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, এই দাবিতেও একটি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। কিন্তু, সেটি মিয়ানমারের পুরোনো ঘটনার। ছবিটি ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

বাংলাফ্যাক্ট জানায়, খাগড়াছড়ি ইস্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের ছবি ও ভিডিওর মধ্যে বেশিরভাগ অন্য দেশের ঘটনার। আবার কিছু পুরনো বা ভিন্ন সময়ে তোলা। এসব ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও ছবি জনমনে অস্থিরতা ও আতঙ্ক তৈরি করছে এবং পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে চলমান গুজব এবং ভুয়া খবর, অপতথ্য প্রতিরোধ এবং জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়ায় দায়িত্ব পালন করছে বাংলাফ্যাক্ট।