খাগড়াছড়ির পানছড়ির হাতিমারা গ্রামে ছোট্ট শিশুর সামনে তার মা রূপসী চাকমাকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী জনসংহতি সমিতি-জেএসএস (সন্তু) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট- ইউপিডিএফ (প্রসীত)- এর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে এ নির্মম ঘটনা ঘটে। জেএসএস বলছে, ইউপিডিএফ এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আবার ইউপিডিএফ'র পাল্টা আক্রমণ- জেএসএস সন্ত্রাসীরা এ কাজ করেছে। তবে এ ঘটনা হয়তো এ পাল্টাপাল্টি দোষারোপ পর্যন্তই শেষ। আমরা আবার নতুন করে, আরেকটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন কোনো লেখার অপেক্ষায় থাকবো। এখানে 'বিচার' বড়ই বেমানান, অপ্রাসঙ্গিক- বন্দুকের গুলিই শেষ কথা। নিজেদের শক্তির জায়গায় সন্তু, প্রসীত এবং নাথানরাই ইশ্বর হয়ে উঠেছেন।
চোখের সামনে মায়ের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখা শিশুটি প্রতিদিন বড় হতে থাকবে এই বিষাক্ত স্মৃতি হাতরে। বড় হয়ে হয়তো বুঝবে বাবার অপারগতা। এমন নিষ্ঠুর ঘটনার পরও বিচার চাইতে সাহস করেনি বাবা হেমন্ত চাকমা। কারণ তিনি জানেন, এখানে বিচারের দ্বারস্থ হওয়া মানে নিজসহ পরিবারের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেওয়া। তিনি হয়তো নিজের দুর্বলতাকে ঢাকবার জন্য এতক্ষণে নিরুপায় স্বামীর মতো সান্ত্বনা বেছে নিয়েছেন- সবই ইশ্বরের ইচ্ছা। হয়তো পুঞ্জিভূত আগুন ভেতরে জ্বালিয়ে রাখবেন তিনি অথবা আজকের ওই শিশুটি। সময় কোনোদিন পক্ষে পেলে সেদিন দেনা-পাওনা মিটিয়ে নেবে।
এটি কেবল একটি ঘটনা। এরকম ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। তবুও এ নিয়ে রাষ্ট্রের সুশীলদের কোনো বক্তব্য শোনা যাবে না। তাদের কানে কি এই শিশুদের কান্না পৌঁছাবে? প্রায়শই তারা পাহাড়ে সেনা উপস্থিতি নিয়ে নাক ছিটকান। সুযোগ পেলেই ব্যানার হাতে জন দশেক ছেলেপেলে নিয়ে মিডিয়ার সামনে এসে বলবেন- পাহাড়ে স্বায়ত্বশাসন জারি করতে হবে, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বছরের বেশিরভাগ সময় তাদের চোখ, কান বন্ধ থাকে। এনজিও'র টাকার গন্ধ নাকে আসলেই এরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। শিখিয়ে দেওয়া বুলি আওরাতে হাজির হবেন- এইবার আমাকে কিছু বলতে দিন। এই ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েও তারা বলবে- পাহাড়ে সেনাশাসন চলছে। যদি সত্যিই সেনাশাসন চলতো, তাহলে কি হত্যার পর থানায় মামলা করার সাহসটুকুও থাকত না? এই সুশীলেরা স্বীকার করুক চাই না করুক- পাহাড়ে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি থাকায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এখনো আছে, না হলে এই পাহাড় তো পুরোপুরি রক্তের নদীতে পরিণত হতো।
পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তপাত আর হত্যাকাণ্ড এখন রুটিন ঘটনা। বান্দরবানে উমেপ্রু মারমা, সাজেকে সাত বছরের শিশু রোমিও ত্রিপুরা কিংবা গত দুই দশকে পাহাড়জুড়ে ঘটে যাওয়া অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। বিচার চাইতেও চায় না বেশিরভাগ পাহাড়িরা। আইনের শাসনের বদলে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভয় আর নীরবতার শাসন। যারা বন্দুক হাতে পাহাড় দখল করে রেখেছে, তারাই এখানে চালায় জীবনের নিয়ন্ত্রণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দিন দিন সীমিত হচ্ছে, আর সেই শূন্যস্থান দখল করে নিচ্ছে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায় শুধু আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নয়, রাষ্ট্রকেও এর দায় এড়ানো চলবে না। পাহাড়ের প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা পড়ে যায় ভয়ের ত্রাসে, অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। পানছড়ির রূপসী চাকমার পরিবার থানায় মামলা করতে কেন যায়নি- তার জবাব কি রাষ্ট্র দিতে পারবে? যতদিন পাহাড়ে রাষ্ট্রের শক্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করা না হবে, যতদিন অবৈধ অস্ত্রধারীদের নির্মূল না করা হবে, ততদিন পাহাড়ের প্রতিটি পরিবার রূপসী চাকমাদের মতো মৃত্যুভয়ে দিন কাটাবে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ভেঙে পাহাড়ে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দ্রুত সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ এর আওতায় এনে জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ'র মতো সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা জরুরি হয়ে উঠছে। নাহলে আজকের-গতকালের এবং আগামী দিনের ভুক্তভোগীদের ভেতরের পুঞ্জীভূত আগুন একসাথে জ্বলে উঠবে। সেদিন আর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। কোনো শক্তিই আর এই আগুন নেভাতে পারবে না।
-গোলাম যাকারিয়া, সাংবাদিক


