‘আমার আর কিছু নাই। দুটা প্রতিষ্ঠান, সব শেষ আমার। অনেক কষ্ট করে ৮০ লাখ টাকার বিনিয়োগ করেছি। পুড়ে সব ছাই। আমি আর কিছুই করতে পারবো না। ফায়ার সার্ভিস থাকলে এই ক্ষতিটা হতো না।’— আব্দুর রাজ্জাক যখন কথাগুলো বলছিলেন তাঁর দুচোখ বেয়ে ঝরছিল অশ্রুধারা। সাজেকের অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া পেদাটিংটিং রেস্টুরেন্ট ও মাচাং বিলাস রিসোর্টের মালিক তিনি।
শুধু রাজ্জাক নন, এমন অন্তত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯৭টি রিসোর্ট, বসত ঘর, রেস্তোরাঁ ও রেস্টুরেন্ট পুড়ে গিয়ে রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন স্বপ্নবিলাসী বিনিয়োগকারীরা। এতে প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অর্ধশত কোটি টাকা বলে জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্তরা। ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় তারা নতুন করে সাজেকে ফায়ার সার্ভিস স্থাপনের দাবি তুলেছেন। স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছেন তাঁরা।
সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে আকস্মিকভাবে আগুন লাগে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে। এতে ৩৪টি রিসোর্ট, ৩৭টি বসত ঘর, ১৯টি দোকানঘর ও ৭টি রেস্টুরেন্ট পুড়ে গেছে। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট, সেনাবাহিনী, বিজিবি পুলিশসহ স্হানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে পুরোপুরি আগুন নিভে রাত আড়াইটায়। আগুনে পুড়ে যাওয়ার প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। তবে পর্যটক শূন্য হয়ে চুপচাপ হয়ে গেছে সাজেক।
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সাজেকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ কেউ নিজেদের পুড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের সামনে ভিড় করছেন। তাদের মধ্যে সাজেক চিলেকোঠা রেস্টুরেন্টের মালিক নাসির উদ্দীন পিন্টু বলেন, গত বছর ঋণ করে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে রেস্টুরেন্ট করেছি। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, বন্যার বন্ধের কারণে ব্যবসা করতে পারিনি। গেল দুই-তিন মাস ভালো ব্যবসা করে ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠছি। গতকাল (সোমবার) দুপুর ১২টার সময়ও আমি ২০/৩০ লাখ টাকার মালিক ছিলাম। এখন ২০/৩০ টাকার মালিকও না। কী করবে বুঝতে পারছি না।
পাহাড়পুঞ্জি রিসোর্টের মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ৪০ লাখ টাকা খরচ করে রিসোর্ট বানিয়েছি। কিন্তু পুড়ে একদম ছাই। আমরা ঋণ করে, মানুষ থেকে হাওলাত করে রিসোর্ট করেছি। চোখের পলকেই সব শেষ হয়ো গেছে। এখানে যদি একটা ফায়ার সার্ভিস থাকতো আমার মনে হয় না এতগুলো ক্ষয়ক্ষতি হতো।
সাজেক কটেজ রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ বলেন, আমাদের ৩৪টি রিসোর্ট, ৩৭টি বসতঘর, ১৯টি দোকানঘর ও ৭টি রেস্টুরেন্ট পুড়ে গেছে। বসতঘরের হিসাব ছাড়া আমাদের ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের জন্য আমরা তিন বছর আগেও সরকারের কাছে আবেদন করেছি। এই সাজেক পর্যটনটাকে বাঁচাতে হলে আমাদের অবশ্যই ফায়ার সার্ভিস লাগবে।
বাঘাইহাট জোনের কমান্ডার লে. কর্নেল খাইরুল আমিন বলেন, প্রতিবছরই সাজেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। হয়তো বড় আকারে এর আগে হয়নি। অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা যায়নি। নাশকতার আলামতও পাওয়া যায়নি। এখানে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট খুব দরকার। কিছু পয়েন্টে রিজার্ভার থাকলে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। আমরা দ্রুত ফায়ার সার্ভিস বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করবো।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা বিবেচনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করার দেয়া বিধিনিষেধ মঙ্গলবার দুপুরে প্রত্যাহার করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। তবে সকালেই সাজেক ছেড়ে গেছেন পর্যটকরা। বিধিনিষেধ প্রত্যাহার হলেও প্রভাব পড়েনি তাতে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ৫ সদস্যদের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। এতে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের উৎস, কারণ উদ্ঘাটন এবং এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধকল্পে সুপারিশ প্রেরণ করবে। এছাড়া কমিটি প্রয়োজন হলে এক বা একাধিক সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে।
তদন্ত কমিটিতে রাঙামাটি জেলার স্থানীয় সরকারের উপপরিচালককে আহবায়ক ও বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এছাড়া বাঘাইছড়ি সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার, দীঘিনালা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী হলেন তদন্ত কমিটির সদস্য। তবে মঙ্গলবার পর্যন্ত সাজেকে ওই তদন্ত কমিটি পরিদর্শনে যাননি।
-পার্বত্য সময়


