সাজেকের রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রে গত সোমবার ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে শতাধিক স্থাপনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং পর্যটন কেন্দ্রের কর্মচারীরা। তাদের অনেকেই এখন কাজ হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
রুইলুই পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্রটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। গত কয়েক দশক ধরে এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কটেজ, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং দোকান। কিন্তু সোমবার দুপুরে ইকো ভ্যালি নামের একটি রিসোর্টে হঠাৎ আগুন লেগে তা দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে গেছে ১০২টি স্থাপনা। এর মধ্যে ৬৪টি কটেজ-রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁ, বাকি ৩৮টি বসতবাড়ি। ব্যবসায়ীদের অনুমান, শুধু কটেজ-রিসোর্টের ক্ষতির পরিমাণই ৩০ কোটির বেশি টাকা।
এই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় কর্মচারীরা। তাদের অনেকেই এখন কাজ হারিয়ে হতাশায় ভুগছেন। হেমরঞ্জন ত্রিপুরা, যিনি ছাউনি ইকো রিসোর্টে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন, তিনি বলেন, “আমার আয় দিয়েই পরিবারের খরচ চালাতাম। ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচও জোগাড় করতাম। এখন কাজ হারিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।” হেমরঞ্জনের মতোই চিম্বাল রেস্টুরেন্টের কর্মচারী কামনা উদয় চাকমাও এখন কর্মহীন। তিনি বলেন, “আগুন থেকে কিছুই বাঁচাতে পারিনি। আমার কাপড়চোপড় পর্যন্ত পুড়ে গেছে। এখন নতুন করে কীভাবে শুরু করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরাও এখন বিপাকে। মকসে জ্বালা ত্রিপুরা তার জমি ভাড়া দিয়ে সানচিতা রিসোর্ট গড়ে তুলেছিলেন। মাসে ১০-১৫ হাজার টাকা ভাড়া পেতেন, যা দিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি ভাড়া পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, “আগামী দিনগুলোতে কীভাবে চলব, তা নিয়ে চিন্তিত।” অন্যদিকে, সালকা রিসোর্টের মালিক রাহুল চাকমা জন দাবি করেন, সরকার যদি বিনাশর্তে বা স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, তাহলে তারা দ্রুত তাদের ব্যবসা পুনর্গঠন করতে পারবেন।
এই বিপর্যয়ের পর ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী। উপজেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে ৩৫ পরিবারকে ৩০ কেজি চাল, কম্বল, শুকনো খাবার এবং ৭,৫০০ টাকা করে দিয়েছে। সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৫,০০০ টাকা এবং শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা ৭০ টন চাল সহায়তার যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা এখনো পৌঁছায়নি।
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেবর্মন বলেন, “আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার জন্য পরিকল্পনা করছি। প্রশাসনের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।” তিনি আরও জানান, যতদিন না ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্নির্মাণ করা যায়, ততদিন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিরীন আক্তার বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী সহায়তা শীঘ্রই পৌঁছে যাবে। আমরা তা দ্রুত বিতরণের ব্যবস্থা করব।”
সাজেকের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু আর্থিক ক্ষতি করেনি, স্থানীয় বাসিন্দা এবং কর্মচারীদের মনোবলও ভেঙে দিয়েছে। তবে তাদের মধ্যে টিকে থাকার এক অদম্য ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে। তারা আশা করছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে আবারও তাদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে পারবেন।

-পার্বত্য সময়