পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্ধারণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের ১২তম সভা স্থগিত করা হয়েছে।
রোববার (১৯ অক্টোবর) টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক পত্রে জানানো হয়, ‘অনিবার্য কারণে’ সভাটি স্থগিত করা হয়েছে। তবে এতে স্থগিতের নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। পত্রে জানানো হয়েছে, পরবর্তী তারিখ ও সময় পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।
আগামী ২২ অক্টোবর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান সুদত্ত চাকমার সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সভা ঘোষণার পর থেকেই এটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, এবারকার সভায় টাস্কফোর্সে কোনো বাঙালি সদস্য নেই। সম্প্রতি একমাত্র বাঙালি সদস্য অ্যাডভোকেট মহিউদ্দীন কবীর পদত্যাগ করায় পুরো কমিটি এখন শুধুমাত্র উপজাতীয় সদস্যদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বাঙালি প্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে এই সভাকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানায়। অভিযোগ ওঠে, টাস্কফোর্সের গঠন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালিদের স্বার্থের পরিপন্থীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার আপত্তির পর সম্প্রতি প্রায় সাড়ে ৫৭ হাজার বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি, টাস্কফোর্সের বর্তমান কাঠামো উপজাতীয় নেতৃত্বের আধিপত্যে পরিচালিত হওয়ায় প্রকৃত উদ্বাস্তুর পুনর্বাসন প্রশ্নে ন্যায্যতা নিশ্চিত হচ্ছে না। এতে প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো একপাক্ষিক হয়ে পড়ছে, যা পাহাড়ে নতুন করে বৈষম্য ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে শনিবার (১৯ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদ। সংগঠনের প্রচার সম্পাদক গাজী ইমরান স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত সুদত্ত চাকমা এখনও ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে বাঙালি প্রতিনিধিবিহীন টাস্কফোর্সের সভা আয়োজন সংবিধান ও প্রশাসনিক ন্যায়ের পরিপন্থী।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, টাস্কফোর্স সভায় বাঙালি উদ্বাস্তুদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যা পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সংগঠনটি অবিলম্বে সভা স্থগিত এবং বাঙালি প্রতিনিধিসহ নতুন টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানায়। পাশাপাশি বাঙালি প্রতিনিধিবিহীন অবস্থায় টাস্কফোর্সের কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর না করার আহ্বান জানানো হয়।
তারা সতর্ক করে জানিয়েছে, বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে সাংবিধানিক পন্থায় কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
অন্যদিকে, টাস্কফোর্সের কর্মকাণ্ডে বৈষম্যের অভিযোগও নতুন নয়। তথ্য অনুযায়ী, ভারত প্রত্যাগত ১২ হাজার ২২৩ উপজাতীয় শরণার্থী পরিবার টাস্কফোর্সের আওতায় প্রতি বছর ১৫ হাজার ৫১৪ মেট্রিক টন চাল রেশন হিসেবে পাচ্ছে। যদিও এই রেশন বিতরণ ছয় মাসের জন্য নির্ধারিত ছিল, তা গত ২৮ বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি গৃহনির্মাণ, কৃষি অনুদান, ঋণ মওকুফ, জমি ফেরত, চাকরিতে পুনর্বহাল, ক্ষতিপূরণ ও নিয়োগে অগ্রাধিকারসহ বিভিন্ন সুবিধাও তারা পাচ্ছে।
কিন্তু একইসঙ্গে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত বাঙালি পরিবারগুলো পুনর্বাসন বা সহায়তার কোনো কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। এ নিয়ে স্থানীয় বাঙালি সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসছে যে, টাস্কফোর্স শুধু এক শ্রেণির জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করছে, যা শান্তিচুক্তির চেতনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাঙালি ও উপজাতীয় উভয় জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত না করলে নতুন করে বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।


