পাহাড়ের সাম্প্রতিক অস্থিরতায় প্রশাসন থেকে তিন পার্বত্য জেলা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করায় পর্যটক শুন্য রাঙ্গামাটি। ফলে এ অঞ্চলের টেক্সটাইল ব্যবসায়ীদের দুর্দিন চলছে। ক্রেতা না থাকায় বিক্রি প্রায় বন্ধ এখানকার উপজাতিদের হাতে তৈরী বিভিন্ন ঐতিহ্যগত পোশাক। বাধ্য হয়েই ছাঁটাই করা হচ্ছে বিক্রয়কর্মীদের। অনেকে বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন দোকানগুলো।
রাঙ্গামাটির টেক্সটাইল ব্যবসায়ীরা জানান, রাঙ্গামাটি শহরসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে টেক্সটাইল দোকানগুলোতে প্রায় পাঁচশ বিক্রয়কর্মী পর্যটন শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে। প্রত্যেকটি বিক্রয়কর্মীর মাসিক বেতন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান ব্যবসার নাজুক অবস্থার কারণে বিক্রয়কর্মীদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়াও অনেক দোকানদার বেতন দিতে না পেরে কর্মী ছাঁটাই করছেন।
রাঙ্গামাটির শহরের তবলছড়ির টেক্সটাইল মার্কেটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টেক্সটাইল মার্কেটের বিভিন্ন দোকানের বিক্রয়কর্মী এবং মালিকরা অবসর সময় পার করছেন। টেক্সটাইল মার্কেটের বিক্রয়কর্মীদের জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, ২০ সেপ্টেম্বর সংঘাতের পর থেকে তাদের ব্যবসার নেই বললে চলে।
তবলছড়ি টেক্সটাইল মার্কেটে এন আর হ্যান্ডিক্রাফটস এর স্বত্তাধিকারী অনুপম ত্রিপুরা পার্বত্য সময়কে জানান, ৫ আগষ্টের পর থেকে তাদের ব্যবসা চলে না। পর্যটক না থাকায় এখানকার ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিমাসে দোকান ভাড়া, বিদুৎ বিল, কর্মচারী বেতনসহ যাবতীয় খরচ বাবদ ৩০ হাজার টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এছাড়াও বেচাকেনা না থাকায় কর্মীও ছাঁটাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সরকারের কাছে তাদের দাবী অতিদ্রুত যদি রাঙ্গামাটিতে পর্যটক প্রবেশের অনুমতি দেয় তাহলে ব্যবসা-বাণিজ্য আবারও ভালো হবে।
বেইন টেক্সটাইলের বিক্রয় কর্মী নম্রদা চাকমা পার্বত্য সময়কে বলেন, এখন পর্যটক খুবই কম। বলতে গেলে একেবারেই পর্যটক নেই। পর্যটক থাকলে বেচাকেনা হয়, না থাকলে একেবারেই নেই। ফলে আর্থিকভাবে খুবই ক্ষতি হচ্ছে।
তবলছড়ির টেক্সটাইল মার্কেট সংলগ্ন জুমবাজার এর বিক্রয় কর্মী রেখা চাকমা জানান, রাঙ্গামাটিতে পর্যটক প্রবেশে নিষেধ থাকায় তাদের কোন বেচাকেনা নেই। বেচাকেনা পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তাদের অনেক টাকা লোকসান হচ্ছে। প্রতিমাসে আমাদের ২-৩ লক্ষ টাকা আর্থিকভাবে লোকসান হচ্ছে।
রাঙাবী টেক্সটাইলের উইজি মারমা জানান, ৫ আগষ্টের পর থেকে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। এখন আবার সরকারীভাবে পর্যটক আসতে নিরুৎসাহিত করায় বেচা-বিক্রি মোটেও নেই। বিগত তিন মাসে তাদের প্রায় ৮ লক্ষ টাকার মতো লোকসান হয়েছে।
রাঙ্গামাটি চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ পার্বত্য সময়কে বলেন, রাঙ্গামাটির ব্যবসা বাণিজ্য পর্যটক নির্ভর। পর্যটক সমাগম যদি কম হয় তাহলে দেখা যায় এর প্রভাব প্রত্যেকটা সেক্টরে পড়ে। এ কয়েকদিনে পর্যটন ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকে বেকার হয়ে পড়েছে। পর্যটন খাতে প্রতিদিন আর্থিকভাবে ক্ষতি হচ্ছে কোটি টাকার কাছাকাছি। এখানকার পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল উপজাতিদের ঐতিহ্যগত যেসব পণ্যগুলো আছে সবগুলো বিক্রয় হয় আগত পর্যটকদের কাছে। পর্যটক না আসার কারণে সবক্ষেত্রে ধস নেমে গেছে।
তিনি আরও জানান, ২০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর ০৮ অক্টোবর থেকে জেলা প্রশাসন থেকে টুরিষ্টদের রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রশাসনের কাছে তিনি অনুরোধ জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের আগমন এবং এখানকার অর্থনৈতিক কর্মচঞ্চলতা ফিরিয়ে নিয়ে আসতে যাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
সম্প্রতি এ বিষয়ে রাঙ্গামাটিতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, অপাতত পর্যটক ভ্রমণ বন্ধ রাখা প্রয়োজন। তাই বন্ধ রাখা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় করে পরে খুলে দেওয়া হবে।
এদিকে, ৬ অক্টোবর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ০৮-৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাঙামাটিতে পর্যটকদের ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়। জেলা প্রশাসন জানায়, পাহাড়ের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং যানমালের ক্ষতি এড়াতে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জেলা প্রশাসন এক জরুরী সভার মাধ্যমে এমন সিন্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে একটানা সাজেক ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে আসছিলো জেলা প্রশাসন। এরপর পুরো জেলায় পর্যটকদের ভ্রমণে বিরত থাকার নির্দেশনা আসে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোরে খাগড়াছড়ি জেলার পানখাইয়া পাড়ায় মোটরসাইকেল চোর সন্দেহে মো. মামুন (৩০) নামে এক যুবককে পেটানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে ১৯ সেপ্টেম্বর জেলার দিঘীনালা উপজেলার লারমা স্কোয়ার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে বাঙালি ও উপজাতিদের মধ্যে সংঘর্ষের রূপ নেয়। ওই ঘটনায় সেখানে তিনজন নিহত হয়েছে।
এরপর ১ অক্টোবর খাগড়াছড়ি জেলায় আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সোহেল রানা নামের এক শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা করেছে পাহাড়ি ছাত্র- যুবরা। এরপর ঘটনাটি কেন্দ্র করে ওইদিন আবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিলো দু-পক্ষ।
- -পার্বত্য সময়


