পার্বত্য চট্টগ্রামের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে সেনাবাহিনীর একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইউপিডিএফ এক বহুমুখী ও ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংগঠনটি স্থানীয় উপজাতি সম্প্রদায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্যাম্প স্থাপন ভণ্ডুল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার, নারী ও শিশুদের দিয়ে বাধা প্রদান, ভুয়া দলিল তৈরি এবং একটি বড় ধরনের জনসমাগম ঘটিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চল বড়মাছড়িকে ঘিরেই এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী এবং খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ির মধ্যবর্তী একটি 'ট্রায়াঙ্গল' বা সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে ইউপিডিএফ দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটিকে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এটি ইউপিডিএফের অপারেশনাল পরিকল্পনা, সশস্ত্র দলগুলোর রসদ সরবরাহ এবং চট্টগ্রামের সমতল থেকে অস্ত্র ও অন্যান্য অবৈধ সামগ্রী সংগ্রহের মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি ইউপিডিএফের শীর্ষ সশস্ত্র নেতৃত্ব, যেমন অর্কিড চাকমা, এই এলাকাতেই অবস্থান করে বলে জানা যায়। অত্র এলাকাটি চাঁদাবাজির জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম, খুন বা অপহরণের একটি নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবেও কুখ্যাত।
এই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর কোনো ক্যাম্প না থাকায় ইউপিডিএফ কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে তাদের কার্যক্রম স্বস্তির সাথে সম্পাদন করে আসছিল। সাম্প্রতিককালে, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনের লক্ষ্যে সেনাবাহিনী উক্ত এলাকায় একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। আর এই উদ্যোগই ইউপিডিএফের মূল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ক্যাম্প স্থাপনকে বাধাগ্রস্ত করতে ইউপিডিএফ শুরু থেকেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করে। সেনাবাহিনী যেখানেই অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের জন্য প্রাথমিক স্থান নির্বাচন করতে যাচ্ছে, সেখানেই মহিলা ও শিশুদের একত্রিত করে বাধা প্রদান করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এক ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনকারী হিসেবে প্রচারের অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। একইসাথে, যে কোনো নির্বাচিত জায়গাকেই ইউপিডিএফ ‘কিয়াং ঘর’ বা বৌদ্ধ মন্দিরের জায়গা বলে দাবি করে স্থানীয় ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে ব্যবহার করে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর পাশাপাশি "সেনাবাহিনী বন বিভাগের জমি দখল করে ক্যাম্প স্থাপন করছে" এমন অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে।

এই বহুমুখী বাধা সত্ত্বেও বিগত ১৮ অক্টোবর সেনাবাহিনী বড়মাছড়ি এলাকায় একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করতে সক্ষম হয়। এমতাবস্থায়, ইউপিডিএফ তাদের প্রচারণাকে আরও তীব্রতর করেছে। তারা "স্থাপিত ক্যাম্পটি বৌদ্ধদের কিয়াং ঘরের জমি দখল করে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে" বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
সূত্র বলছে, ইউপিডিএফের সশস্ত্র কমান্ডার অর্কিড চাকমার সরাসরি পরিকল্পনায় এই ক্যাম্প স্থাপন বন্ধ বা উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে এক চূড়ান্ত ষড়যন্ত্র চলছে। এর অংশ হিসেবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার উপজাতি জনসাধারণের সমাগম ঘটিয়ে একটি বিশাল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর সূত্র ধরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ইউপিডিএফের উদ্যোগে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পোস্টারিং করতেও দেখা গেছে। একইসাথে, স্থাপিত ক্যাম্পের স্থানটি যে একটি কিয়াং ঘরের জায়গা ছিল, তা প্রমাণ করার লক্ষ্যে ভুয়া দলিল তৈরির মতো প্রতারণামূলক কার্যক্রমও চলমান আছে। ইউপিডিএফের এরূপ মরিয়া হয়ে ওঠার পেছনে মূল কারণ হলো, এই অস্থায়ী ক্যাম্পটি পুরোপুরি কার্যকর হলে তাদের সার্বিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ এবং চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক কার্যকরীভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আশঙ্কা করছে, এই অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া গুইমারার মতো আরেকটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির গভীর প্রয়াস চালাচ্ছে। বরাবরের মতো এবারও তারা তাদের ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা প্রদানের জন্য এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীকে সাধারণ উপজাতিদের মুখোমুখি করার অপচেষ্টা নিয়েছে।


