বান্দরবান শহর থেকে পাহাড়ি পথে নীলগিরির দিকে যাত্রা শুরু হতেই চোখে পড়ে এক অনন্য দৃশ্যপট। দুপুরের রোদ পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে চড়িয়ে পড়েছে, আর তার আলোয় সবুজের ভাঁজে ভাঁজে যেন জেগে উঠেছে জীবনের নতুন গল্প। কলার সারি, পেঁপে, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম কিংবা কফি সবকিছু মিলিয়ে পাহাড়ে এখন জুম চাষের একচেটিয়া রাজত্বে চিড় ধরেছে। তার জায়গা নিচ্ছে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও বাণিজ্যিক মিশ্র চাষ।
এক সময় পাহাড়ি জনজীবন ছিল একেবারেই জুম চাষনির্ভর। বছরে একবার ফলন, পরে অনিশ্চয়তা। এখন সেই গল্প পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিক কৃষি ও প্রকল্প-সহায়তায় পাহাড়ে কাজুবাদাম, কফি, মাশরুম, এমনকি মসলা চাষও বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের পরিচালক শহীদুল ইসলাম জানান, এই অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু কফি ও কাজুবাদামের জন্য আদর্শ। প্রকল্পের শুরুতে দেশে কাজুবাদাম চাষ হতো মাত্র ১,৮০০ হেক্টরে—এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,২০০ হেক্টরে। কফির ক্ষেত্রেও একই চিত্র; মাত্র ৬৫ হেক্টর থেকে বেড়ে তা এখন ১,৮০০ হেক্টরে ছড়িয়ে পড়েছে।
জুম চাষের বিকল্প হিসেবে দারুচিনি, গোলমরিচ, তেজপাতা, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি মসলার চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, “পাহাড়ে আগে কেউ মসলা চাষের কথা চিন্তাই করেনি। এখন আমরা হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। তারা বুঝতে পারছেন—জমি ও শ্রম একই থাকলেও মসলায় লাভ বেশি।”
মাঠপর্যায়ে জৈব সার ব্যবহার, চারা রোপণের কৌশল, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় পাহাড়ি কৃষকদের মধ্যে মসলা চাষের আগ্রহ বেড়েছে।
স্বল্প খরচ, বেশি লাভ এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকার কারণে মাশরুম চাষে ঝুঁকছেন অনেক পাহাড়ি নারী। এতে শুধু আয় নয়, পুষ্টির দিক থেকেও উপকৃত হচ্ছে পরিবারগুলো। মাশরুমের ঔষধি গুণাবলির কারণে পাহাড়ে এর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।
লামার কৃষক মংসাউ মারমা বলেন, “আগে বছরে একবার জুম চাষ করতাম, আয় হতো সীমিত। এখন এক জমিতে তিন-চার রকমের চাষ করছি। আয় বাড়ছে, মাটিও ঠিক থাকছে।”
তবে সব সাফল্যের মাঝেও চ্যালেঞ্জের শেষ নেই। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পণ্য পরিবহনের রাস্তা না থাকায় কৃষকদের বাজারে পণ্য পৌঁছাতে হয় দালালের মাধ্যমে। তাতে দাম পড়ে যায়, লাভ কমে যায়। পণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় দামি ফল বা মসলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘টিস্যুকালচার ও হর্টিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ পাহাড়ি কৃষিকে আধুনিক করে তুলতে নতুন একটি অধ্যায় লিখছে। এই প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাশরুর জানান, বান্দরবানের বালাঘাটায় একটি বিশ্বমানের টিস্যুকালচার ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। এই ল্যাব থেকে রোগমুক্ত, উন্নত জাতের ফল ও ফুলের চারা সরবরাহ করা হবে। এতে শুধু চাষই নয়, তরুণ প্রজন্মের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।

-পার্বত্য সময়