মিয়ানমারে সামরিক শাসন ও গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা অব্যাহত থাকলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক ক্রমেই স্বাভাবিক হচ্ছে। সামরিক পোশাক ছেড়ে প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় থাকা মিন অং হ্লাইং সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দেশ সফর করে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান ও লালগালিচা অভ্যর্থনা।
গত মে মাসের শেষ দিকে ভারত সফরের পর জুনে চীন এবং জুলাইয়ে লাওস সফর করেন মিন অং হ্লাইং। আগস্টে থাইল্যান্ড সফরেও তাকে দেওয়া হয় উষ্ণ অভ্যর্থনা। একই সঙ্গে মিয়ানমারকে আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের কার্যক্রমে পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে থাইল্যান্ড।
কূটনৈতিক অঙ্গনে এমন উষ্ণতা দেখা গেলেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসেনি। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অভিযানে একাধিক হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
অর্থাৎ বিদেশে যখন মিন অং হ্লাইংকে ঘিরে কূটনৈতিক সৌজন্য ও লালগালিচা, তখন দেশের সাধারণ মানুষের বাস্তবতা যুদ্ধ, বোমা হামলা ও প্রাণহানিতে আটকে আছে।
আসিয়ানের চাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ
মিয়ানমারের সংকট সমাধানে আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা থাকলেও মিয়ানমার সরকার সেটিকে কার্যত উপেক্ষা করে চলছে। একই সঙ্গে আটক বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চির মুক্তির দাবিও প্রত্যাখ্যান করেছে তারা।
আসিয়ানের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির আহ্বান জানানো হলেও নেপিদো জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানে বাইরের কোনো মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই।
প্রতিবেশী দেশগুলো আলাদাভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করায় মিয়ানমার সরকার আসিয়ানের সম্মিলিত চাপ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের হিসাব
মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্কের পেছনে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থও রয়েছে। থাইল্যান্ডের জন্য মিয়ানমার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি, শ্রমবাজার, বাণিজ্য ও সীমান্ত নিরাপত্তার কারণে। চীন দেশটির অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আগ্রহী। ভারতের ক্ষেত্রে সীমান্ত নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়ালেই মিয়ানমারের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে না। দেশটির বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা এখনো মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে বিদেশে রাষ্ট্রীয় সম্মান পেলেও দেশের ভেতরে সামরিক সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
লালগালিচার বিপরীতে দেশটির ভেতরে সংঘাত
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমার গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটে নিমজ্জিত। মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও প্রতিরোধ বাহিনীর লড়াই চলছে। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে।
সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা ও অভিযানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে। বাড়িঘর ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং নিরাপত্তাহীনতা বহু মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিন অং হ্লাইংয়ের পোশাক ও পদবি বদলালেও মিয়ানমারের সংঘাতের চরিত্র বদলায়নি। একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—প্রতিবেশী দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ কি মিয়ানমারের ওপর আঞ্চলিক চাপকে দুর্বল করে দিচ্ছে?
আসিয়ানের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধ, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ—এসব শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারকে স্বাভাবিক কূটনৈতিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সংকট আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
বিদেশের লালগালিচা তাই মিন অং হ্লাইংয়ের কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়ালেও মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের প্রাণঘাতী বাস্তবতা এখনো বদলায়নি।


