আজ ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস। ২০১৭ সালের এই দিনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার পর নতুন করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন প্রায় ১৫ লাখের কাছাকাছি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ এবং ভাসানচরে ৩৩ হাজার ৮১৯ জন রয়েছে।

তবে সরকারি নিবন্ধনের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের হিসাব ধরলে বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করা হয়। বিভিন্ন বেসরকারি ও অন্যান্য সংস্থার হিসাবে, অনিবন্ধিতসহ দেশে রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা ১৫ লাখ হতে পারে।

প্রায় নয় বছর ধরে এই বিপুল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করলেও তাদের প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তালিকা তৈরি, যাচাই এবং প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বড় পরিসরের স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন হয়নি। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, বসতভিটায় ফেরার অধিকার ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি হয়নি।

এদিকে সংকটটি ২০১৭ সালের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশে আবারও রোহিঙ্গা প্রবেশ শুরু হয়। ইউএনএইচসিআর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জানিয়েছিল, আগের ১৮ মাসে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

২০২৬ সালের জুনের হিসাবেও ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪০ জন নতুন আগমনকারীকে বায়োমেট্রিকভাবে শনাক্ত করার তথ্য দিয়েছে।

অর্থাৎ পুরোনো রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আটকে থাকার পাশাপাশি নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের চাপও বাংলাদেশের মানবিক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে।

কক্সবাজারে ৩৩ ক্যাম্পে দীর্ঘস্থায়ী বসতি
বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রধান অংশ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। ইউএনএইচসিআর বলছে, এসব ক্যাম্প অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ। কক্সবাজারের বাইরে ভাসানচরেও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করা হয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় খাদ্য, পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষার চাহিদা স্থায়ী আকার নিয়েছে।

এটি এখন আর কয়েক মাস বা এক-দুই বছরের জরুরি পরিস্থিতি নয়। ২০১৭ সালে যে শিশুরা পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের বড় একটি অংশ এখন কৈশোর ও তরুণ বয়সে পৌঁছেছে। নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশের শৈশব ও শিক্ষাজীবন ক্যাম্পের মধ্যেই কাটছে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ শিশু এবং নারী। ২০২৫ সালের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, মোট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি শিশু।

ফলে প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মানবিক সহায়তার প্রয়োজনও তত দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে।

বাংলাদেশের ওপর শুধু মানবিক নয়, আর্থিক চাপও
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে ক্যাম্প পরিচালনা করছে। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে একই জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষা ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ কার্যক্রমের অর্থায়ন আবেদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ কোটি ডলার। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএনএইচসিআর ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরোর একটি উন্নয়ন সহায়তা ঘোষণা করে, যার লক্ষ্য ছিল কক্সবাজারের ১২ লাখ রোহিঙ্গার পাশাপাশি প্রায় ৭০ হাজার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও সহনশীলতা বাড়ানো।

এ থেকে সংকটটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়-রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিচালনার ব্যয় শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানের কারণে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা দিতে হচ্ছে।

কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি মানবিক বা পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি স্থানীয় উন্নয়ন ও সম্পদের ওপর চাপ কমানোর সঙ্গেও যুক্ত।

নতুন আগমন থামেনি, রাখাইনেও নিরাপত্তা ফেরেনি
রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে আসার প্রধান কারণ রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হওয়ার পর রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা সংকট বাড়ে। ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের ঘটনা সেই পরিস্থিতিরই ধারাবাহিকতা।

ইউএনএইচসিআরের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে রাখাইনে সংঘাত ও নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে আসা অব্যাহত ছিল।

২০২৬ সালেও রাখাইনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে একদিকে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আলোচনা চলছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের ভেতর থেকেই নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।

এই বাস্তবতা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করেছে। কারণ যে অঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা, সেখানেই এখনো সংঘাত এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিবর্তন রয়েছে।

ক্যাম্পের পরিস্থিতি থেকে সমুদ্রপথেও বাড়ছে ঝুঁকি
দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন এবং মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছেড়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া দুটি নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনায় পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দুটি নৌযানে মোট পাঁচ শতাধিক মানুষ ছিল।

এই ঘটনা দেখিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আটকে নেই। নিরাপদ ও টেকসই সমাধান না থাকায় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার পথ বেছে নিচ্ছে।

সংকটের সমাধান প্রত্যাবাসননির্ভর
রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসের নয় বছর পূর্তিতে বাংলাদেশে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। এর সঙ্গে গত দেড় বছরে নতুন করে আসা প্রায় দেড় লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হয়নি। রাখাইনে সংঘাত চলছে, নতুন বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা রয়েছে এবং বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখনো কার্যকর সময়সূচি তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশের অবস্থান শুরু থেকেই-রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই সংকটের স্থায়ী সমাধান। তবে প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই।

এই অবস্থান শুধু বাংলাদেশ সরকারের নয়; প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদেরও প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে মিয়ানমার বাংলাদেশের তালিকা থেকে তিন লাখের বেশি মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার ঘোষণা দেওয়ায় প্রত্যাবাসন আলোচনা নতুন করে সক্রিয় হয়েছে।

তবে এই ঘোষণা এখনো বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন শুরুর সমান নয়।

কারণ বাংলাদেশের ক্যাম্পে থাকা ১২ লাখের বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু একটি তালিকা যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করছে না। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে নিরাপত্তা, বসবাসের সুযোগ, নাগরিকত্ব বা কার্যকর আইনি মর্যাদা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও নিষ্পত্তি করতে হবে।

নয় বছর পর রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন দীর্ঘায়িত হচ্ছে, কিন্তু নিজ দেশে ফেরার পথ এখনো কার্যকরভাবে খুলেনি।

প্রত্যাবাসনের নতুন হিসাব: ৮ লাখ ২৮ হাজারের তালিকায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন যাচাই

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নয় বছর ধরে চলা অচলাবস্থার মধ্যে ১৫ আগস্ট ২০২৬-এ মিয়ানমার নতুন একটি যাচাই-তথ্য প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাবে আরও ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দেশটি জানিয়েছে।

মিয়ানমার বলছে, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করবে তারা। দেশটির ভাষায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

তবে এই ঘোষণার মধ্যেই প্রত্যাবাসনের জটিলতাগুলোও স্পষ্ট হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের পাঠানো তালিকার প্রায় অর্ধেক মানুষের তথ্য এখনো যাচাই হয়নি। আবার যাচাই করা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যেও ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে মিয়ানমার ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নয়, ‘রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০১৮-১৯ সালের উদ্যোগেও ফেরেনি কেউ
মিয়ানমারের সর্বশেষ বিবৃতিতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

দেশটির দাবি, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে তিন দফায় প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি মিয়ানমারে ফিরে যায়নি।

বাংলাদেশের সঙ্গে ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি হয়েছিল। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দল ফেরানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালেও চীনের উদ্যোগে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরতে রাজি হয়নি।

পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান এবং দেশজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। ২০২৩ সাল থেকে রাখাইনে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত বাড়ায় প্রত্যাবাসনের পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এবার তিন লাখের বেশি মানুষকে স্বীকৃতি, কিন্তু ‘রোহিঙ্গা’ নামে নয়
মিয়ানমারের সর্বশেষ যাচাইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার ঘোষণা।

তবে মিয়ানমারের বক্তব্যে ‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় ব্যবহার করা হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরং দাবি করেছে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগত গোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই এবং বাংলাদেশে থাকা জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে ‘বাঙালি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

মিয়ানমারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরসার হামলার পর দেশটির সামরিক বাহিনী ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান চালায়। তাদের দাবি, ওই সময় উত্তর রাখাইনের বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। পরে দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে চলে যায়। এই হিসাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে—এমন তথ্যকে মিয়ানমার ভুল বলে দাবি করছে।

মিয়ানমার আরও বলেছে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৬৮ এবং ১৯৯২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৪৯৫ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তারা গ্রহণ করেছিল।

বাংলাদেশের হিসাব নিয়ে মিয়ানমারের আপত্তি
বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা নিয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যের সঙ্গে ঢাকার হিসাবের বড় পার্থক্য রয়েছে।

মিয়ানমার দাবি করছে, রাখাইন থেকে বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে-এই তথ্য সঠিক নয়। দেশটির বক্তব্যে বাংলাদেশে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে ‘বাঙালি’ বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ এই তথ্যকে ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

বাংলাদেশের হিসাবের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নিবন্ধন তথ্যও রয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আগের দফায় আসা জনগোষ্ঠী এবং পরবর্তী নতুন আগমন মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে।

এছাড়া নতুন করে আসা এবং নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত জনগোষ্ঠী বিবেচনায় বাংলাদেশে মোট রোহিঙ্গার সংখ্যা আরও বেশি বলে বিভিন্ন হিসাব রয়েছে।

তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের ভবিষ্যৎ কী
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় সংখ্যাগত জটিলতা তৈরি হয়েছে তালিকার যাচাই না হওয়া অংশ নিয়ে।

বাংলাদেশ যে তালিকা দিয়েছে, তার মধ্যে ৪ লাখেরও বেশি মানুষের বিষয়ে মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করাই সম্ভব হয়নি বলে মিয়ানমার জানিয়েছে।

ফলে তিন লাখের বেশি মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার ঘোষণা প্রত্যাবাসনের একটি সম্ভাব্য তালিকা তৈরি করলেও বাংলাদেশে থাকা পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধান তৈরি হয়নি।

এর সঙ্গে রয়েছে নতুন করে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়টি। ২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাব ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ প্রত্যাবাসনের পুরোনো তালিকা যাচাইয়ের পাশাপাশি নতুন করে আসা জনগোষ্ঠীর অবস্থানও ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে।

মিয়ানমারের শর্ত: রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে হবে
মিয়ানমার বলেছে, যাচাই করা সাবেক বাসিন্দাদের ফিরিয়ে নিতে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে। তবে এর জন্য রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া প্রয়োজন।

এই শর্তটি প্রত্যাবাসনের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কারণ বর্তমানে রাখাইনের বড় একটি অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতও চলছে।

ফলে মিয়ানমার যে ব্যক্তিদের ফেরত নেওয়ার কথা বলছে, তাদের ফেরার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কী হবে-তা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যাচাই প্রক্রিয়াকে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা বলে রোহিঙ্গা সংগঠনের আপত্তি
মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা-ইউসিআর।

সংগঠনটি মিয়ানমারের ‘বাঙালি’ বর্ণনাকে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা এবং ২০১৭ সালের ঘটনাবলিতে নিজেদের ভূমিকা আড়াল করার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যের একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে দীর্ঘ ইতিহাস ও সংস্কৃতি রয়েছে।

ইউসিআর মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়াতেও আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ে নিবন্ধিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং কিছু মানুষকে ‘অযাচাইযোগ্য’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রত্যাবাসনের অধিকার থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সংগঠনটি যাচাই প্রক্রিয়াটি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে পরিচালনার দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, রাখাইনে নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের আইনি নিশ্চয়তা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন করা উচিত নয়। তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে।

‘রোহিঙ্গা নয়, বাঙালি’-প্রত্যাবাসনের আগে পরিচয়ের প্রশ্নেই আটকে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনায় নতুন করে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা হলো সংখ্যার পাশাপাশি পরিচয়ের বিরোধ। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো তালিকার ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করার কথা বলছে মিয়ানমার। কিন্তু একই সঙ্গে দেশটি ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব স্বীকার করছে না এবং বাংলাদেশে থাকা এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে ‘বাঙালি’ হিসেবে বর্ণনা করছে।

প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষকে শুধু মিয়ানমারের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা আর তাকে তার নিজস্ব জাতিগত পরিচয় ও সমঅধিকারসহ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া-দুটি এক বিষয় নয়।

মিয়ানমারের সর্বশেষ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ‘ভুল তথ্য ও অপতথ্য’ ছড়ানো হচ্ছে। দেশটির দাবি, অন্যান্য দেশে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের এমন একটি জাতিগত পরিচয় দেওয়া হচ্ছে, যার অস্তিত্ব মিয়ানমারে নেই। একই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত।

তবে বাংলাদেশ এই তথ্যকে ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এই অবস্থানকে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা—ইউসিআর বলেছে, রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাস বিকৃতি এবং ২০১৭ সালের ঘটনাবলিতে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা। সংগঠনটির দাবি, রোহিঙ্গারা রাখাইন অঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠী এবং তাদের পরিচয় অস্বীকার করাই দীর্ঘদিনের নিপীড়নের অন্যতম ভিত্তি।

মিয়ানমারের বক্তব্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের ঘটনাকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে
রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিয়ে বর্তমান বিরোধের সঙ্গে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের সহিংসতার ব্যাখ্যাও সরাসরি যুক্ত।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরসা রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। মিয়ানমারের দাবি, এর জবাব হিসেবে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ পরিচালনা করে।

দেশটির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় আরসার হুমকির কারণে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে সরে যায় এবং বিপুলসংখ্যক ‘বাঙালি’ বাংলাদেশে চলে যায়।

মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, ২০১৭ সালের ঘটনার আগে বুথিডং, মংডু ও রাথেডং এলাকায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। তাদের হিসাবে, পরবর্তী সময়ে দুই লাখের বেশি মানুষ ওই এলাকায় থেকে যায় এবং প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায়। এই হিসাবের ভিত্তিতেই মিয়ানমার বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে-এমন প্রচলিত হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলোর বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউসিআরের দাবি, আরসার হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালায় এবং এর ফলেই ২০১৭ সালে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাত লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

অর্থাৎ একই ঘটনার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা এখনো প্রত্যাবাসন আলোচনার ভেতরে সক্রিয়।

‘রোহিঙ্গা’ পরিচয় অস্বীকারের রাজনৈতিক গুরুত্ব
মিয়ানমারের ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে আসছে।

এই পরিচয় বিতর্কের প্রভাব প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও সরাসরি পড়ছে।

রোহিঙ্গাদের কাছে প্রত্যাবাসন মানে শুধু বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের ভূখণ্ডে ফিরে যাওয়া নয়। তারা যে পরিচয়ে নিজেদের জানে, সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং মিয়ানমারে সমান অধিকার পাওয়ার বিষয়টিও এর সঙ্গে যুক্ত।

অন্যদিকে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মূলত ‘রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনাটি ‘কে মিয়ানমারের বাসিন্দা ছিলেন’—এই প্রশ্নে এগোলেও ‘তাদের কী পরিচয়ে এবং কী অধিকার নিয়ে ফিরতে হবে’-এই প্রশ্নের স্পষ্ট সমাধান এখনো সামনে আসেনি।

এ কারণেই তিন লাখের বেশি মানুষকে যাচাই করার ঘোষণা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে নাগরিকত্ব ও অধিকার প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।

মিয়ানমারের এই বয়ান কি প্রত্যাবাসন নাকি পুরোনো কৌশলে?
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতির একটি দিককে বিশ্লেষকরা প্রত্যাবাসন আলোচনার সম্ভাব্য নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছেন। কারণ দীর্ঘ সময় পর দেশটি আবারও প্রকাশ্যে বলছে যে যাচাই করা কিছু মানুষকে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে তারা কাজ করছে।

কিন্তু একই বিবৃতিতে রোহিঙ্গা পরিচয় অস্বীকার, বাংলাদেশের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি এবং অতীতের সামরিক অভিযানের ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ এটিকে মিয়ানমারের পুরোনো কৌশলের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, অতীতেও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে। তিনি এমন পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও কাউকে গ্রহণযোগ্য এবং অন্য কাউকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আসিফ মুনীরের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চলমান আলোচনা ও সমালোচনার বিপরীতে নিজেদের একটি পাল্টা বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। তার মতে, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী নেই-এই বক্তব্যও সেই প্রচেষ্টার অংশ।

তবে একই সঙ্গে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মিয়ানমারের বিবৃতির ফলে দীর্ঘদিন পর প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

প্রত্যাবাসনের আসল বাধা কোথায়?
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনের সামনে তিনটি প্রশ্ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে-

প্রথমত, পরিচয়: মিয়ানমার কি রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় মেনে নিয়ে তাদের ফেরার অধিকার নিশ্চিত করবে?

দ্বিতীয়ত, অধিকার: ফিরে যাওয়ার পর তাদের নাগরিকত্ব, চলাচল, শিক্ষা, জীবিকা, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক-সামাজিক অধিকারের কী নিশ্চয়তা থাকবে?

তৃতীয়ত, নিরাপত্তা: রাখাইনে চলমান সংঘাতের মধ্যে ফিরে যাওয়া মানুষদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?

এই তিন প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু তালিকা যাচাই বা কয়েক লাখ মানুষকে ‘সাবেক বাসিন্দা’ হিসেবে শনাক্ত করা প্রত্যাবাসনকে বাস্তব সমাধানে নিয়ে যেতে পারবে না।

আর এখানেই নয় বছর ধরে আটকে থাকা সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি রয়েছে-বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত দিতে চায়, রোহিঙ্গারাও নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফিরতে চায়; কিন্তু ফিরে যাওয়ার পর তারা কী পরিচয়ে, কী অধিকার নিয়ে এবং কার নিরাপত্তার নিশ্চয়তায় সেখানে থাকবে—সেই রাজনৈতিক সমাধান এখনো হয়নি।

ফিরে গেলেই কি প্রত্যাবাসন? নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও রাখাইনের নিয়ন্ত্রণে বড় তিন অনিশ্চয়তা
সীমান্ত পার হওয়া প্রত্যাবাসনের শেষ নয়। রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজন অধিকার, নিরাপত্তা ও নিজভূমিতে টেকসইভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আলোচনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কতজনকে ফেরত নেওয়া হবে-তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, ফিরে যাওয়ার পর তারা কী পরিচয়ে, কী আইনি মর্যাদায় এবং কী ধরনের নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করবে।

কারণ ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বড় অংশ শুধু সহিংসতার কারণে ঘর হারায়নি; এর আগে বহু বছর ধরে তারা নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং জীবিকার সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। জাতিসংঘের নথিতে এসব বিধিনিষেধের মধ্যে বিয়ে, সন্তান নেওয়ার সংখ্যা ও ব্যবধান, বাড়ি নির্মাণ ও মেরামতের ওপরও নিয়ন্ত্রণের কথা উঠে এসেছে।

ফলে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে কাউকে রাখাইনে পাঠানো হলে প্রত্যাবাসনের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। রোহিঙ্গাদের জন্য যে পরিবেশ থেকে তারা পালিয়ে এসেছিল, সেই একই বৈষম্যমূলক কাঠামো যদি সেখানে বহাল থাকে, তাহলে বাস্তুচ্যুতির কারণটি থেকেই যাবে।

১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন: সংকটের আইনি ভিত্তি
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ ইতিহাসে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার নথিতে বলা হয়েছে, এই আইনের প্রয়োগের ফলে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে রাষ্ট্রহীনতার মধ্যে পড়ে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও মানবাধিকার ব্যবস্থাগুলো আইনটি সংস্কার করে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্বে সমান ও স্বচ্ছ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

আইনটির অধীনে নাগরিকত্বের বিভিন্ন শ্রেণি তৈরি করা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখানো এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা দীর্ঘদিন ধরে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে, অনেক রোহিঙ্গার পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি বা প্রমাণ দেখানো সম্ভব হয়নি।

এই আইনি কাঠামোর প্রভাব শুধু পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তার সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার, ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সেবায় সমান প্রবেশাধিকারের প্রশ্নও জড়িয়ে পড়ে।

২০১৫ সালে রোহিঙ্গাদের হাতে থাকা অস্থায়ী ‘হোয়াইট কার্ড’ বাতিল করা হলে তাদের ভোটাধিকারও কার্যত শেষ হয়ে যায়। জাতিসংঘের নথিতে এটিকে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হারানোর ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাগরিকত্বের পাশাপাশি চলাচলও ছিল নিয়ন্ত্রিত
রোহিঙ্গাদের জন্য সমস্যা শুধু নাগরিকত্বের স্বীকৃতিতে আটকে ছিল না। রাখাইনে তাদের চলাচলের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ ছিল।

জাতিসংঘের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধানী মিশনের নথিতে উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জীবিকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করা হতো।

এমনকি বিয়ে ও পরিবার পরিকল্পনার ওপরও বিধিনিষেধ ছিল। বাড়িঘর নির্মাণ বা মেরামতের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক অনুমতির প্রয়োজন হতো বলে জাতিসংঘের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে প্রত্যাবাসনের আগে এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে-ফিরে যাওয়ার পর একজন রোহিঙ্গা কি স্বাধীনভাবে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারবেন? কাজ করতে পারবেন? সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারবেন? হাসপাতালে যেতে পারবেন? নিজের বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে পারবেন? নিজের জমি ও সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে পারবেন?

এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর ছাড়া প্রত্যাবাসনকে টেকসই বলা কঠিন।

‘নাগরিকত্ব যাচাই’ আর পূর্ণ নাগরিকত্ব এক বিষয় নয়
মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কথা বলে আসছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা হলো, এমন কোনো যাচাই প্রক্রিয়া তাদের নিজস্ব পরিচয় অস্বীকার করে অন্য কোনো পরিচয় গ্রহণের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

জাতিসংঘের নথিতে এমন ঘটনাও উঠে এসেছে যেখানে ‘বাঙালি’ পরিচয় গ্রহণে অনিচ্ছুক রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় সমস্যার মুখে পড়েছেন।

এ কারণেই বর্তমান প্রত্যাবাসন আলোচনায় ‘যাচাই’ শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের পাঠানো তালিকা থেকে যাদেরকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হলো, সেটি প্রত্যাবাসনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি হতে পারে। কিন্তু সেই স্বীকৃতি যদি পূর্ণ নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়ের অধিকার ও সমান রাজনৈতিক অধিকারে রূপ না নেয়, তাহলে সমস্যার মৌলিক অংশ অমীমাংসিত থাকবে।

আইসিজের আদেশেও উঠে এসেছে অধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্ন
রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গণহত্যা সনদের অধীনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা চলছে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। আদালতের বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর ঝুঁকি তখনও বিদ্যমান ছিল। আদালত আরও উল্লেখ করে, রাখাইনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যা শরণার্থীদের নিজ এলাকায় স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করে।

পরবর্তী আইনি কার্যক্রমেও রোহিঙ্গাদের পূর্ণ ও সমান নাগরিকত্ব, বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা এবং নিজেদের পরিচয় প্রকাশের অধিকার নিয়ে বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়াতেও প্রত্যাবাসনকে শুধু সীমান্ত পার হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না।

রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ এখন আর আগের মতো নেই
প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যাগুলোর একটি হলো রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।

২০১৭ সালে যে এলাকায় রোহিঙ্গারা বসবাস করত, সেই রাখাইন এখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।

ফলে বাংলাদেশ যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতেও প্রস্তুত থাকে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে-এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন আলোচনা চলছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে রাখাইনের বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এসেছে। এই বাস্তবতা প্রত্যাবাসনকে শুধু কূটনৈতিক নয়, একটি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সমস্যাতেও পরিণত করেছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার বর্তমান তথ্যও দেখাচ্ছে, রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। মানবিক সহায়তায় প্রবেশাধিকারও বিভিন্ন এলাকায় সীমিত।

যে দেশে ফেরার কথা, সেখানেই এখনো নিরাপত্তা সংকট
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো-তাদের নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।

কিন্তু নিজভূমিতে ফেরার অধিকার আর তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে যাওয়ার নিরাপত্তা-দুটি আলাদা বিষয়।

রাখাইনে এখনো সংঘাত চলমান। ফলে প্রত্যাবাসিত মানুষদের কোথায় রাখা হবে, তাদের বসতভিটা থাকলে সেখানে ফিরতে দেওয়া হবে কি না, ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন বা নিরাপত্তা কাঠামো তাদের কী ধরনের সুরক্ষা দেবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবিক সহায়তা।

রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার পর যদি খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার না পান, তাহলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। জাতিসংঘও রাখাইনে সংঘাতের কারণে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।

প্রত্যাবাসনের আগে যে নিশ্চয়তাগুলো প্রয়োজন
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যে অবস্থান নিয়ে আসছে, তার মূল বিষয় হলো-রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন।

এই চারটি শর্ত বাস্তবে নিশ্চিত করতে হলে অন্তত কয়েকটি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

প্রথমত-আইনি মর্যাদা।
রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হলে সংকটের মূল কারণ থেকে যাবে। নাগরিকত্ব বা সমঅধিকার নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত-নিরাপত্তা।
ফেরার পর আবার সহিংসতা, নির্বিচার আটক বা নিপীড়নের আশঙ্কা থাকলে প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছামূলক হওয়ার প্রশ্নই ওঠে।

তৃতীয়ত-চলাচলের স্বাধীনতা।
নিজের গ্রাম বা নির্ধারিত এলাকার বাইরে যেতে না পারলে প্রত্যাবাসিত মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না।

চতুর্থত-জীবিকা ও সেবা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, পানি এবং কাজের সুযোগ ছাড়া কয়েক লাখ মানুষের পুনর্বাসন বাস্তবে অসম্পূর্ণ থাকবে।

পঞ্চমত-বসতভিটা ও সম্পত্তির অধিকার।
যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের জমি ও বাড়ির কী হবে—এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি প্রত্যাবাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ষষ্ঠত-পর্যবেক্ষণ।
ফেরত যাওয়ার পর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য স্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা না থাকলে প্রত্যাবাসনের পরের পরিস্থিতি যাচাই করা কঠিন হবে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতেও নাগরিকত্ব, চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং বৈষম্য দূর করার বিষয়গুলোকে রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মোকাবিলার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশ্বে ছড়িয়ে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ লাখ রোহিঙ্গা: সবচেয়ে বড় বোঝা বাংলাদেশের কাঁধে

রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর বর্তমান বিস্তৃতি বোঝা যায় না। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা ও আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ লাখ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ বাংলাদেশে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতরেও পাঁচ লাখের বেশি রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা রয়েছেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। রোহিঙ্গাদের বিশ্বব্যাপী মোট সংখ্যা ২২–২৫ লাখ। এ ধরনের হিসাব বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া গেলেও এর পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক আদমশুমারি নেই। ফলে দেশভিত্তিক সংখ্যা যোগ করে একটি নির্দিষ্ট মোট সংখ্যা বলা কঠিন।

জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৩০০। এর মধ্যে বাংলাদেশে ১১ লাখ ৭৮ হাজার, মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫০০, ভারতে ২২ হাজার ৭০০, ইন্দোনেশিয়ায় ২ হাজার ৬০০ এবং থাইল্যান্ডে প্রায় ৫০০ জন ছিল।

এর বাইরে মিয়ানমারের ভেতরেই রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার ৬৪৭ বলে বিভিন্ন উৎসের ভিত্তিতে ইউএনএইচসিআর উল্লেখ করেছে।

অর্থাৎ রোহিঙ্গা সংকটের মানচিত্র এখন একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু এই পুরো সংকটের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বহন করছে বাংলাদেশ।

মিয়ানমারেই রয়ে গেছে পাঁচ লাখের বেশি
রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এখনো মিয়ানমারের ভেতরে রয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ মিয়ানমারে প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার ৬৪৭ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা ছিলেন। এই সংখ্যার মধ্যে বাস্তুচ্যুত এবং নিজ এলাকায় থাকা-দুই ধরনের মানুষই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের অবস্থাও নিরাপদ নয়।

রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত চলতে থাকায় রোহিঙ্গারা নতুন করে বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ছেন।

এটি প্রত্যাবাসন আলোচনার জন্যও বড় সমস্যা।

কারণ বাংলাদেশ থেকে যাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছে, তারা যে পরিবেশে ফিরে যাবেন, সেই একই এলাকায় বর্তমানে সংঘাত চলছে।

মালয়েশিয়া: বাংলাদেশ ছাড়া সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়স্থলগুলোর একটি
মিয়ানমারের বাইরে রোহিঙ্গাদের অন্যতম বড় গন্তব্য মালয়েশিয়া।

ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি শেষে মালয়েশিয়ায় মিয়ানমার থেকে আসা নিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৪। এর মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ১৪৪ জন রোহিঙ্গা।

তবে এই সংখ্যা মালয়েশিয়ায় থাকা সব রোহিঙ্গাকে বোঝায় না। ইউএনএইচসিআর নিজেই সতর্ক করেছে যে তাদের নিবন্ধন পরিসংখ্যান নতুন আগমনকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করে না।

মালয়েশিয়ার সমস্যা হলো, দেশটি ১৯৫১ সালের রোহিঙ্গা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয়। ফলে রোহিঙ্গাদের আইনি অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চিত।

তাদের বড় অংশ শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কাজের অধিকার ও আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকে।

ভারতে ২২ হাজার
ইউএনএইচসিআরের ২০২৫ সালের শেষের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে মিয়ানমার থেকে আসা রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা ও আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার ৭০০।

দিল্লি, জম্মু, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা পরিবারের উপস্থিতির কথা বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

তবে ভারতের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও নিবন্ধিত সংখ্যা এবং প্রকৃত বসবাসকারীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।

ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড: সংখ্যায় কম, ঝুঁকিতে বেশি
ইউএনএইচসিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২ হাজার ৬০০ এবং থাইল্যান্ডে প্রায় ৫০০ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা ও আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন।

কিন্তু সংখ্যার তুলনায় এসব দেশের গুরুত্ব অন্য জায়গায়।

সমুদ্রপথে মিয়ানমার থেকে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা রোহিঙ্গাদের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিরাপদ স্থলপথ ও নিজভূমিতে প্রত্যাবাসনের পথ বন্ধ থাকলে মানুষ যখন সমুদ্রকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়, তখন নৌযানডুবি, নিখোঁজ হওয়া, পাচার এবং শোষণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

২০২৬ সালেও মিয়ানমারের উপকূল থেকে সমুদ্রপথে পালানোর ঘটনায় জাতিসংঘ গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

রোহিঙ্গাদের মোট বৈশ্বিক সংখ্যা নিয়ে একটি নির্ভুল, হালনাগাদ আন্তর্জাতিক আদমশুমারি নেই।

২৫ আগস্টের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে যাচ্ছে।

এই সময়ে বাংলাদেশ ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে আরও মানুষ এসেছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখন কক্সবাজারে বসবাস করছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারে এখনো নাগরিকত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত, রাখাইনে সংঘাত চলছে এবং রোহিঙ্গা পরিচয় নিয়েও রাজনৈতিক বিরোধ অব্যাহত।

তাই ২৫ আগস্ট ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি শুধু- ‘রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে?’ এটি হওয়া উচিত-‘রোহিঙ্গারা কী শর্তে ফিরবে, কে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ফিরে গিয়ে তারা কী অধিকার পাবে?’

কারণ বাংলাদেশ আর অনির্দিষ্টকাল এই সংকট বহন করতে পারবে না। আবার এমন প্রত্যাবাসনও বাংলাদেশের স্বার্থে নয়, যেখানে কয়েক বছর পর একই জনগোষ্ঠীকে আবার সীমান্তের দিকে ছুটতে হবে।

তাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ‘মিয়ানমার ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে স্বীকৃতি দিয়েছে’-এখানেই শেষ নয়। বরং আসল কথা হলো—নয় বছর পরও প্রত্যাবাসনের দরজা পুরোপুরি খোলেনি; শুধু দরজার সামনে একটি নতুন তালিকা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সেই তালিকাকে বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি নিশ্চিত করতে হবে-এই প্রক্রিয়া যেন আবার ২০১৮ ও ২০১৯ সালের মতো কাগজপত্র ও বৈঠকের মধ্যেই আটকে না যায়।

কারণ বাংলাদেশের জন্য সময় এখন শুধু কূটনৈতিক বিষয় নয়। প্রতিদিনের বিলম্ব মানে আরও একটি দিন ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার দায়িত্ব বাংলাদেশের কাঁধে।

আর রাখাইনে সংঘাত চলতে থাকলে সেই সংখ্যা আবার বাড়ার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।