২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওমর আহমদ অন্য কয়েকজন রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে ফিরে যান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এখন জনশূন্য হয়ে যাওয়া হোয়ার সিরি গ্রামে। দুই মাস আগে এই গ্রামেই তারা আরাকান আর্মির ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন। ওমর আহমদ বলেন, গ্রামবাসীরা যখন কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করতে ফিরে যান, তখন তারা দেখতে পান তাদের ঘরবাড়ি লুট ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, আর পড়ে আছে স্বজন ও প্রতিবেশীদের দেহাবশেষ।

তিনি বলেন, ‘গ্রামে কোনো গবাদিপশু দেখিনি, অথচ আগে প্রতিটি বাড়িতেই গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগি ছিল। শুনেছি আরাকান আর্মি সেগুলো নিয়ে গেছে। আমি সেই ধানক্ষেতেও গিয়েছিলাম, যেখানে প্রায় ৮০ জন গ্রামবাসী—যাদের মধ্যে আমার নিকট আত্মীয়ও ছিল—হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে দেখি চারদিকে কঙ্কাল আর মাথার খুলি ছড়িয়ে আছে। কাপড়গুলো তখনও অক্ষত ছিল, কিন্তু শরীরের মাংস পচে গিয়েছিল।’

হিউম্যান রাইটসের অনুসন্ধান বলছে, ২০২৪ সালের ২ মে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের বুথিডং টাউনশিপের হোয়ার সিরি গ্রামে (বার্মিজ ভাষায় যার নাম হতান শাউক খান) আরাকান আর্মি অন্তত ১৭০ জন রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে থাকতে পারে। এছাড়া আরও শত শত মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সময় আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর মধ্যে কাছাকাছি সেনা ক্যাম্পগুলোকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ চলছিল। গ্রামবাসীরা পালানোর চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।

এই গণহত্যার বিষয়টি এক বছরেরও বেশি সময় পর নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়, যখন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের পৌঁছান। উদাহরণস্বরূপ, ওমর আহমদ ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে পৌঁছাতে সক্ষম হন।

আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান হোয়ার সিরিতে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, রাখাইনে অবস্থানকালে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আরাকান আর্মি জোর করে ভিডিও বার্তা দিতে বাধ্য করেছিল, যাতে তারা বাহিনীটির বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে।

এই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের ২ মে সংঘটিত গণহত্যা ও এর পরবর্তী ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে ৪১ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের বর্ণনাগুলো স্যাটেলাইট চিত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও এবং গবেষকদের হাতে পৌঁছানো বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে যাচাই করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধ আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে। তবে আরও গুরুতরভাবে, আরাকান আর্মির বেসামরিক মানুষ হত্যা ও সম্পদ ধ্বংসের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে- বেসামরিক মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা, হত্যা, অবৈধ আটক, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ, অগ্নিসংযোগ ও সম্পদ ধ্বংস, লুটপাট ও আহতদের চিকিৎসা না দেওয়া

যদিও এই হত্যাযজ্ঞের দুই বছর পার হয়ে গেছে, ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান ও এর সশস্ত্র শাখা আরাকান আর্মি এখন পর্যন্ত কোনো জবাবদিহি বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেয়নি।

এক লিখিত জবাবে ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান দাবি করেছে, ‘আরাকান আর্মি সব সামরিক অভিযানে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইন ও জেনেভা কনভেনশন কঠোরভাবে অনুসরণ করেছে।’

তারা আরও দাবি করে, হোয়ার সিরিতে তারা ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আলোকে আগাম সতর্কতা, সামঞ্জস্যতা ও পার্থক্য নির্ধারণের নীতি’ মেনে চলেছে এবং ‘মুসলিম কমিউনিটি নেতাদের সহযোগিতায় লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ পরিচালনা করেছে।’

কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধান এসব দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংস্থাটি বলছে, আরাকান আর্মি এখনো রোহিঙ্গাদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।

রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র সংঘাত

আরাকান আর্মি ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের লক্ষ্য রাখাইন জনগণের জাতীয় মুক্তি অর্জন। ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকে তারা বিভিন্ন সময়ে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং নির্বাচিত বেসামরিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

আরাকান আর্মি দ্রুত রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করতে শুরু করলে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপ, গোলাবর্ষণ ও স্থল হামলার মাধ্যমে নির্বিচারে বেসামরিক মানুষের ওপর আক্রমণ চালায়।

২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রার সময় উভয় পক্ষই বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালায়। সেনাবাহিনী জোরপূর্বক রোহিঙ্গাদের—এমনকি কিশোরদেরও—নিয়োগ করতে থাকে, যা রোহিঙ্গা মুসলিম ও রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।

বিপদের মুখে হোয়ার সিরি

হোয়ার সিরি গ্রামের অবস্থান ছিল বুথিডং-রাথেদং সড়কের পাশে, মায়ু নদীর কাছে। গ্রামের উত্তর পাশে ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ১৫ নম্বর মিলিটারি অপারেশন কমান্ড (এমওসি-১৫) এবং দক্ষিণ-পূর্বে ছিল ৫৫১ নম্বর লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন (এলআইবি-৫৫১)। ফলে গ্রামটি যুদ্ধের একেবারে মাঝখানে পড়ে যায়।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে, আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রার সময় আশপাশের বহু রোহিঙ্গা পরিবার হোয়ার সিরিতে আশ্রয় নেয়। কারণ, অতীতের হামলাগুলোতে গ্রামটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল।

কিয়া জিঙ্গা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা বশির আহমদ বলেন, ‘হোয়ার সিরি এমন একটি গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল, যেটা অন্য গ্রাম ধ্বংস হলেও টিকে ছিল।’ মে মাসের মাঝামাঝি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন গ্রামবাসীদের ২০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিতে বলে, যারা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়বে। না দিলে গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
গ্রামবাসীরা ভয় পেতে থাকে যে সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করা এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার উপস্থিতি তাদের আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।

হোয়ার সিরির হত্যাযজ্ঞ

২০২৪ সালের ২ মে সকালে গ্রামবাসীরা সাদা পতাকা হাতে বুথিডং শহরের দিকে পালাতে শুরু করেন।

যখন তারা ‘তোইন্না মুরা’ নামের একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছান, তখন আরাকান আর্মির যোদ্ধারা বিভিন্ন দিক থেকে হাজির হয়। কোনো সতর্কতা ছাড়াই তারা গুলি চালানো শুরু করে।

নূর জাহান বলেন, ‘হঠাৎ সবাই চুপ হয়ে গেল। তখনই বুঝেছিলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’

হালিম হোসেন বলেন, ‘মানুষ চিৎকার করছিল আর চারদিকে দৌড়াচ্ছিল। সামনে ও পাশ থেকে গুলি আসছিল। পালানোর কোনো পথ ছিল না।’

কবির আহমদ বলেন, ‘তারা মাত্র পাঁচ ফুট দূর থেকে গুলি চালায়। প্রথমে আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়। তারপর স্ত্রী ও ছোট মেয়ে। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার আগে আমাকে ১ লাখ ৪৫ হাজার কিয়াত দিয়ে বলেছিল পালিয়ে যেতে।’

অনেকে গ্রামে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কেউ ধানক্ষেতে আশ্রয় নেন, কেউ উ হ্লা ফে এলাকায় পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশই আরাকান আর্মির হাতে ঘেরাও হয়ে পড়েন।

রাশিদা হাতু বলেন, ‘আরাকান আর্মি লোকজনকে একটি ধানক্ষেতে জড়ো করে গুলি করে। কেউ রক্ষা পায়নি। আমি আহত অবস্থায় মৃতের ভান করে বেঁচে যাই।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৭০ জন নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৯০ জন শিশু। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

হত্যাযজ্ঞের পর

বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের অনেককে আটক করে আরাকান আর্মি তাদের কাছ থেকে টাকা ও গয়না লুট করে নেয়। পরে অনেককে জোর করে নাসাওর পাড়া নামে একটি অস্থায়ী শিবিরে পাঠানো হয়, যেখানে এখনো তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও চিকিৎসা নেই, চলাফেরার স্বাধীনতা নেই, এমনকি জোরপূর্বক শ্রমেও বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, পুরো হোয়ার সিরি গ্রাম পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এখনো কেউ সেখানে ফিরে গিয়ে বসবাস করতে পারেনি।

আরাকান আর্মি স্বীকার করেছে যে গ্রামে ‘ল্যান্ডমাইন ও অবিস্ফোরিত বিস্ফোরক’ রয়েছে, তাই মানুষ ফিরতে পারছে না। তবে একই সঙ্গে তারা সেখানে নতুন কিছু স্থাপনা ও সম্ভবত চেকপোস্ট নির্মাণ করেছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এখন বিচার দাবি করছেন। তবে তারাও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন, কারণ বাংলাদেশ সরকার তাদের অধিকার সীমিত করেছে এবং মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মিয়ানমার জান্তা ও আরাকান আর্মির চলমান নির্যাতনের কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।