বর্তমানে ভারতজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী ও ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। নাম শুনে এটি প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক দল মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি অনলাইন মিম-ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন, যা অল্প সময়েই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ১৬ মে এই ঘটনার পরপরই সিজেপির আত্মপ্রকাশ ঘটে বলে জানা যায়। এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বর্তমানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি, যা ভারতের অনেক মূলধারার রাজনৈতিক দলের অনলাইন অনুসারীর চেয়েও বেশি। অন্যদিকে আইনি নোটিশের কারণে সম্প্রতি ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) থেকে দলটির অ্যাকাউন্ট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেখানে দুই লাখের বেশি অনুসারী ছিল। তবে এর মধ্যেই অনেক রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী ও শিল্পী এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন।
কে এই অভিজিৎ দিপকে
৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে পুনে থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক রিলেশনস বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন।
এর আগে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলের সোশ্যাল মিডিয়া টিমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ডিজিটাল মিম প্রচারণাতেও তার ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কী?
দলটির দাবি অনুযায়ী, এটি এমন মানুষের কণ্ঠস্বর যারা রাষ্ট্র বা ব্যবস্থার বাইরে পড়ে গেছে। তারা নিজেদের ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে পরিচয় দেয়।
এখানে যোগদানের শর্তও ব্যতিক্রমী—সদস্য হতে হলে বেকার, অলস এবং নিয়মিত অনলাইনে সক্রিয় থাকতে হবে, পাশাপাশি সমালোচনামূলক ও ব্যঙ্গাত্মক ‘র্যান্ট’ করার দক্ষতা থাকতে হবে।
মিম, অ্যানিমেশন ও গ্রাফিকসের মাধ্যমে দলটি বেকারত্ব, শিক্ষা সংকট এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
যেখান থেকে শুরু
২০২৬ সালের ১৫ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘দেশে কিছু এমন তরুণ রয়েছে, যারা ককরোচের (আরশোলা) মতো; তারা না কোনো কর্মসংস্থান পায়; না নিজেদের কোনো পেশাগত অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী হয়ে ওঠে; কেউ তো হয় আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট এবং এরপর তারা সবাইকেই আক্রমণ করা শুরু করে দেয়।’’
তার এই মন্তব্যের জেরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর পরদিন ১৬ মে অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্সে' (সাবেক টুইটার) দেশের সকল ‘আরশোলাদের’ জন্য একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের ঘোষণা দেন।
রাজপথে ব্যঙ্গের প্রকাশ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পর এবার রাজপথেও দেখা গেছে এই আন্দোলনের প্রভাব। দিল্লির ঐতিহাসিক প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে শত শত তরুণ তেলাপোকা মাস্ক পরে এবং পরীক্ষার গাইড হাতে নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়।
তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে এবং সাম্প্রতিক পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রযুক্তিগত সমস্যা ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে।
বিশেষ করে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সংক্রান্ত বিতর্ক এবং শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো তরুণদের হতাশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সমাবেশে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে আসেন। তিনি বলেন, ‘তেলাপোকারা কখনো ভয় পায় না।’
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
ভারতে ইনস্টাগ্রামে দুই কোটিরও বেশি অনুসারী নিয়ে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ এখন অনেক মূলধারার রাজনৈতিক দলের চেয়েও বড় অনলাইন উপস্থিতি তৈরি করেছে।
ভারী পুলিশ মোতায়েন ও ব্যারিকেডের মধ্যেও অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ এখন একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—মিম ও ব্যঙ্গ কি কেবল অনলাইন সংস্কৃতির অংশ থাকবে, নাকি তা বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে?


