মিয়ানমারের ম্যাগওয়ে অঞ্চলের নাতমৌ এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ মাদকের চালান জব্দের ঘটনাটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ১১.৭ বিলিয়ন মিয়ানমার কিয়াত বা ৭০ কোটি টাকা মূল্যের এই চালানটি আরাকান আর্মির উচ্চপদস্থ নেতার কাছে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বিশ্লেষক ও সীমান্ত বিশেষজ্ঞদের সন্দেহ, এই বিশাল পরিমাণ মাদকের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পাচার করা।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৬ এপ্রিল নাতমৌতে একটি টয়োটা প্রাডো এবং একটি টয়োটা হিলাক্স গাড়ি থেকে ৩৯টি বস্তায় মোট ৭৮ লাখ পিস সিন্থেটিক মাদক (ইয়াবা সদৃশ ট্যাবলেট) জব্দ করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই মাদকের বাজারমূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, চালানটি রমেথিন থেকে শুরু হয়ে নাতমৌ ও কালে হয়ে রাখাইন রাজ্যের ‘আন’ টাউনশিপে পৌঁছানোর কথা ছিল। আন টাউনশিপ বর্তমানে আরাকান আর্মির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে নিজেদের সামরিক ব্যয় মেটাতে এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কিনতে মাদক চোরাচালানকেই অর্থের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে আরাকান আর্মি। এই ৫৫ লাখ ডলারের বিশাল চালানটি তাদের সেই ‘ওয়ার ফান্ড’ বা যুদ্ধ তহবিলেরই একটি অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
যদিও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দাবি করছে চালানটি তাদের অভ্যন্তরীণ এলাকার জন্য ছিল, কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান এবং পাচারের রুট বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। রাখাইনের আন টাউনশিপ থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত অত্যন্ত নিকটবর্তী। সংশ্লিষ্টদের সন্দেহ, আরাকান আর্মি এই বিশাল পরিমাণ ট্যাবলেট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে নাফ নদী বা দুর্গম সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর নীল নকশা তৈরি করেছিল।
বিশেষ করে বাংলাদেশে সিন্থেটিক মাদকের বিশাল চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত নগদ অর্থ সংগ্রহের এই কৌশল আরাকান আর্মির জন্য নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর টিকে থাকার পেছনে ‘মাদক বাণিজ্যের’ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।
রাখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আরাকান আর্মি মাদক সাম্রাজ্য বিস্তার করছে বলে মনে করছেন আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জব্দকৃত এই মাদকের চালানটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মাদকের এই প্রবাহ যদি এখনই ঠেকানো না যায়, তবে এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর পড়বে।
জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য চেয়ে বড় অংকের পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য এই ঘটনা একটি আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।


