ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মণিপুর ও নাগাল্যান্ডে নাগা-কুকি সংঘর্ষকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। গত কয়েক মাসে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে আসাম রাইফেলসের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন।

দেশটির স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ হামলার ঘটনা ঘটে মঙ্গলবার রাতে মণিপুরের সেনাপতি জেলায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর প্রস্তুতির সময় আসাম রাইফেলসের একটি ক্যাম্পে উত্তেজিত জনতা হামলা চালায়। তারা ক্যাম্প লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে।

নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, সেনাপতি জেলার ওক্লং এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত নাগা বিদ্রোহী সংগঠন ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-আইজাক-মুইভা (এনএসসিএন-আইএম)-এর সদস্যদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়ার পর তল্লাশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হয়। এ সময় স্থানীয় লোকজন নিরাপত্তা বাহিনীকে বাধা দেন।

এর আগের দিন নাগাল্যান্ডের চুমৌকেডিমা জেলায় সন্দেহভাজন বিস্ফোরণে আসাম রাইফেলসের এক সদস্য নিহত হন। পুলিশ জানিয়েছে, একটি গাড়িতে করে যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে থাকা একটি অটোরিকশায় রাখা বিস্ফোরক দূর থেকে বিস্ফোরণ ঘটানো হতে পারে। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হন।

এরও আগে, গত ৬ জুলাই মণিপুরের উখরুল জেলায় আসাম রাইফেলসের একটি বহরে হামলা চালানো হয়। এতে বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হন।

স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে কুকি-জো সম্প্রদায়ের অন্তত ১৫ জন এবং নাগা জনগোষ্ঠীর ১১ জন রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, নাগা ও কুকি—দুই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তৃত হওয়ায় সংঘাতের প্রভাবও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জড়িয়ে পড়ছে এবং নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে।

মণিপুরের উখরুল জেলায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি স্থানীয় বিরোধ থেকে নাগা-কুকি উত্তেজনার সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। পরে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ১৩ মে কুকি সম্প্রদায়ের সদস্যরা ছয়জন নাগাকে অপহরণ করে। পরে ১১ জুন তাদের মরদেহ উদ্ধার হলে নাগা সংগঠনগুলো প্রতিবাদ শুরু করে। এর জেরে ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) ১৭ মে থেকে মণিপুরের সেনাপতি জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া জাতীয় মহাসড়কে অবরোধ কর্মসূচি দেয়।

অবরোধের কারণে কুকি-প্রধান কাংপোকপি জেলায় জরুরি পণ্য সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে কুকি সংগঠনগুলো।

উল্লেখ্য, মণিপুরে ২০২৩ সালের মে থেকে মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে চলমান সংঘর্ষে সরকারি হিসাবে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক নাগা-কুকি উত্তেজনা উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের জাতিগত পরিচয়, ভূমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তা–সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান না হলে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে।