বিশ্বজুড়ে আজ ৩০ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস। ২০১০ সালে একটি প্রযুক্তিভিত্তিক ওয়েবসাইটের উদ্যোগে দিবসটির সূচনা হলেও বর্তমানে এটি কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (টুইটার) কিংবা ইউটিউব—বর্তমান সময়ে এগুলোকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো এখন মানুষের চিন্তা-ভাবনা, যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে। ভৌগোলিক দূরত্বকে সম্পূর্ণ অতিক্রম করে এটি পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে মুহূর্তেই যুক্ত করেছে। প্রবাসে থাকা প্রিয়জনের মুখ দেখা কিংবা কথা বলা এখন আর স্বপ্ন নয়—স্ক্রিনের এক ক্লিকেই তা সম্ভব।

এই ভার্চুয়াল সংযোগ পৃথিবীকে একটি ছোট গ্রামে পরিণত করেছে, যেখানে কেউ আর একা নয়।

তথ্য ও শিক্ষায় গণবিপ্লব

তথ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এনেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। যেকোনো খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে জনমনে, তৈরি হয় তাৎক্ষণিক সচেতনতা।

শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক গ্রুপ, পেজ এবং ভিডিও কনটেন্ট পড়াশোনাকে আরও সহজ, আনন্দদায়ক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান এখন উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্রথাগত ব্যবসার ধারণা বদলে দিয়ে এটি তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার।

অল্প পুঁজিতেই ঘরে বসে অনেকেই সফল ব্যবসা গড়ে তুলছেন। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে সঠিক ক্রেতার কাছে, যা নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।

ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও

তবে মুদ্রার যেমন দুটি দিক থাকে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও রয়েছে কিছু নেতিবাচক দিক। অতিরিক্ত আসক্তি, গুজব ছড়িয়ে পড়া, ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস—এসব বিষয় সামাজিক ও মানসিক জীবনে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির সুবিধা পেতে হলে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

করোনাকালে গুরুত্ব আরও স্পষ্ট

করোনা মহামারির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব আরও বেশি করে সামনে আসে। লকডাউনের সময়ে মানুষ এই মাধ্যমেই চিকিৎসা তথ্য, জরুরি সহায়তা, অনলাইন শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রের যোগাযোগ এবং প্রিয়জনের খোঁজখবর নিয়েছে। অনেকের জন্য এটি মানসিক সহায়তারও বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস

বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবসের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে। বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর অবদান তুলে ধরতেই এই দিবসের সূচনা করা হয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৯৭ সালে চালু হওয়া সিক্সডিগ্রিজ ছিল বিশ্বের প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা প্রতিষ্ঠা করেন অ্যান্ড্রু ওয়েইনরিচ। অল্প সময়েই এর ব্যবহারকারী সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়, তবুও আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তি তৈরি করে দেয় এটি।

এরপর ২০০২ সালে আসে ফ্রেন্ডস্টার এবং ২০০৩ সালে চালু হয় লিংকডইন। পরে একে একে আসে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাটসহ অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম, যা আজ কোটি কোটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বর্তমান ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০০ থেকে ৬১২ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ থেকে ৭৫ শতাংশ।

অন্যদিকে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। দেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড মিলিয়ে ইন্টারনেট সংযোগের সংখ্যা ১৩ কোটিরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ৬০ লাখ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি, ভিডিও, মতামত ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার হচ্ছে।

বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়, এটি দায়িত্বশীল, নিরাপদ এবং ইতিবাচক ব্যবহারের বার্তাও বহন করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য, শিক্ষা, ব্যবসা ও মানবিকতার প্রসারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাই সময়ের দাবি।