বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম তার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক জটিলতা, সশস্ত্র দ্বন্দ্ব এবং অবৈধ দখলের অভিযোগেও আলোচিত। এই অঞ্চলটি শুধুমাত্র পাহাড়-নদী-জঙ্গলে ঘেরা নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি রাঙামাটি জেলার সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজার এলাকায় একটি কলেজ নির্মাণকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের ভাবিয়ে তোলে: এটি কি সত্যিই উন্নয়নের নিদর্শন, নাকি পরিবেশ ধ্বংস আর রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যের বহিঃপ্রকাশ?
‘সাজেক কলেজ’ নামে গড়ে উঠতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান একটি সংরক্ষিত বনভূমিতে। সরকারি অনুমোদন ও পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া সেখানে যে কোনও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আরও গভীর। বিভিন্ন তথ্যসূত্র এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই নির্মাণ প্রকল্পটির পেছনে সক্রিয় রয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামক সশস্ত্র সংগঠনটি। রাজনৈতিক পরিচয়ে ‘উন্নয়নের’ আবরণে এই সংগঠন অতীতে নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল- হিংসাত্মক কর্মসূচি, সেনাবাহিনী-বিরোধিতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার এবং ভূমি দখল।
ইউপিডিএফ সরাসরি কলেজ নির্মাণে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক একটি স্মারকলিপির কথা উল্লেখ করা যায়, যা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও ইউপিডিএফ-সমর্থিত পিসিপির একাধিক বিবৃতিতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, যা প্রকল্পটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সুস্পষ্ট করে।
সংরক্ষিত বনভূমির গুরুত্ব কেবল বৃক্ষ, প্রাণী বা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিরও অংশ। এই বনভূমিগুলোতে বছরের পর বছর ধরে প্রাকৃতিক ভারসাম্য টিকে রয়েছে। কিন্তু এই স্থানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে টিনসেড বিল্ডিং নির্মাণ, গাছ কেটে পথ তৈরি, সড়ক উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যকলাপ বন আইনের চরম লঙ্ঘন।
পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরণের অপরিকল্পিত নির্মাণ কেবল বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে না, বরং সেটি পরবর্তী সময়ে ভূমিদখলের ‘গেটওয়ে’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অতীতেও ইউপিডিএফ ও সমমনা সংগঠনসমূহ বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে তথাকথিত স্কুল বা প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করে পরে সেগুলোকে ঘাঁটি রূপে ব্যবহার করেছে।
সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভ্রান্তি ও শঙ্কা বিরাজ করছে। একদল মানুষ মনে করছেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। অপরদিকে, অনেকেই বুঝতে পারছেন- এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে নিরপেক্ষ উদ্দেশ্য নেই। তাদের কথায় উঠে এসেছে অতীতের প্রতারণা, ব্যবহার এবং রাজনৈতিক কৌশলের ছায়া।
একজন গ্রামবাসী সাংবাদিকদের বলেন, “শিক্ষা ভালো জিনিস, কিন্তু এটা যদি কোনো দলের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হয়, তাহলে সেটা আর শিক্ষা নয়, দখল।” এই বক্তব্যে যে সন্দেহ, সেটি একেবারে অমূলক নয়। বরং গত এক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নামে বহু প্রকল্প রাজনৈতিক ও সশস্ত্র প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনাটি এক গভীরতর সংকেত বহন করে—উন্নয়ন যদি স্বচ্ছ না হয়, তা হলে তা আখেরে পরিবেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। যখন কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠী কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের ‘প্রমোটার’ হয়ে ওঠে, তখন সেটি শিক্ষার ছদ্মবেশে ভূমি দখলের প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়। এমন একটি সংগঠন, যারা অতীতে সরকারি প্রকল্পে বাধা দিয়েছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে, তারাই হঠাৎ শিক্ষাব্রতী হয়ে উঠেছে—এটা সন্দেহজনক না হয়ে যায় না।
সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কাজ বন্ধ না হওয়া এবং নির্মাণ আবার শুরু হওয়া প্রশাসনিক দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি। বন বিভাগ, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অবৈধ নির্মাণ চিরতরে বন্ধ হয়। শুধুমাত্র চিঠি দেওয়া বা মৌখিক বার্তা নয়, আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
এই প্রসঙ্গে একটি মূল প্রশ্ন উঠে আসে: উন্নয়ন কি কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি প্রকৃতি ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করাও তার একটি অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব? প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে যেখানে মানুষ, প্রকৃতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে একসাথে বিবেচনা করা হয়।
সাজেক কলেজ নির্মাণ প্রকল্পটি উন্নয়নের নামে পরিবেশ ও আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের একটি দৃষ্টান্ত। এটি শুধু বনের গাছ কাটার বিষয় নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক খেলায় শিক্ষাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়াস। তাই সময় এসেছে এই ধরনের কৌশলগত অপতৎপরতা রোধে রাষ্ট্রকে আরও সচেতন, সক্রিয় ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করার।
কাজী হাসিবুল রাব্বী,
গণমাধ্যমকর্মী।


