গোলাম যাকারিয়া

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক জলবায়ু, শান্তিচুক্তি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক। তবে এই অভ্যন্তরীণ সংকটকে যখন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের আয়নায় রেখে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন নতুন কিছু প্রশ্ন অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে চলে আসে। বিশেষ করে, আনরিপ্রেজেন্টেড নেশনস অ্যান্ড পিপলস অর্গানাইজেশন বা ইউএনপিও-র মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-র দীর্ঘদিনের সক্রিয় উপস্থিতি এবং সেখানে তিব্বত, বেলুচিস্তান, পশ্চিম পাপুয়া কিংবা পূর্ব তুর্কিস্তানের মতো অঞ্চলের আন্দোলনকারীদের সাথে একই টেবিলে বসা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গভীর চিন্তার অবকাশ রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায়- জেএসএস কি স্রেফ নিজেদের মৌলিক অধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি খুঁজছে, নাকি তারা ধীরে ধীরে বেলুচিস্তানের মতো আত্মনিয়ন্ত্রণ কিংবা অখণ্ডতা ভঙ্গের দিকেই পা বাড়াচ্ছে?

ইউএনপিও কোনো সাধারণ আন্তর্জাতিক এনজিও বা জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন নয়। সংগঠনটির দাবি অনুসারে- এটি এমন একটি বিশ্বমঞ্চ, যেখানে মূলত সেইসব জাতি বা ভূখণ্ডের প্রতিনিধিরা জড়ো হয়, যারা নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নিগৃহীত মনে করে। এই সংগঠনের সদস্য তালিকায় তিব্বতের কথা বলা যায়, যা চীনের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গড়তে চায়; বেলুচিস্তানের কথা বলা যায়, যা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি অস্বীকার করে আন্দোলন চালায়; কিংবা পশ্চিম পাপুয়ার কথা বলা যায়, যাদের মূল লক্ষ্যই হলো ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা হয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা।

সম্প্রতি জেএসএসের নিজস্ব মুখপত্রে দাবি করা হয়েছে যে, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ সিটিতে অনুষ্ঠিত ইউএনপিও-র ২১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে। উক্ত অধিবেশনে জেএসএসের প্রতিনিধি হিসেবে প্রীতিবিন্দু চাকমা ও ইঞ্জেবি চাকমা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। গৃহীত রেজুলেশনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং উক্ত অঞ্চলকে পুরোপুরি 'বেসামরিকীকরণ' করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়।

ইউএনপিও’র ২১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রতিনিধি হিসেবে প্রীতিবিন্দু চাকমা ও ইঞ্জেবি চাকমা অংশগ্রহণ করেন। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক একটি ফোরামে প্রকাশ্যে গিয়ে এভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও সামরিক উপস্থিতি তুলে ধরে রেজুলেশন পাস করানো নিছক অধিকার আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি স্পষ্টতই পার্বত্য ইস্যুটির একটি আন্তর্জাতিকীকরণ।

দেশের ভেতরে শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের দাবি তোলা, আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেলুচিস্তান বা পশ্চিম পাপুয়ার মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সহযাত্রী হয়ে কাজ করার মাঝে একটি বিশাল বৈপরীত্য বিদ্যমান। যদি জেএসএসের মূল লক্ষ্য কেবল সংবিধানের ভেতরে থেকে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নই হতো, তবে তাদের সমস্ত আন্তর্জাতিক দৌড়ঝাঁপ কেবল চুক্তি পালনের তাগিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু ইউএনপিও-র সম্মেলনে তাদের নিয়মিত উপস্থিতি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে অভিযুক্ত করে প্রস্তাব পাস করানো এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রথাগুলোকে হাইলাইট করার কৌশল নির্দেশ করে যে, তারা বিশ্বমঞ্চে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক ও নিপীড়িত রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

বেলুচিস্তানের উদাহরণটি এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। পাকিস্তানে বেলোচ রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল স্বায়ত্তশাসন ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি দিয়ে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের কারণে তা এক ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধের দিকে মোড় নেয়। বেলোচ নেতারা তখন নিজেদের সংকটকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যান এবং বিভিন্ন বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন।

আজকে জেএসএস যদি আন্তর্জাতিক ফোরামে বেলোচ কিংবা কুর্দি প্রতিনিধিদের মতো একই কৌশল অবলম্বন করে, তবে সেটি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের সংকেত দেয়। ইতিহাস বলে, যেকোনো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন যখন আন্তর্জাতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের প্ল্যাটফর্মে জায়গা করে নেয়, তখন ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন বা বিদেশি ইন্ধনে তা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে রূপান্তরিত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়।

আধুনিক রাজনৈতিক যুদ্ধে কেবল পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র হাতে অবস্থান করাই একমাত্র রাস্তা নয়। আসল লড়াইটি অনেক সময় হয় আন্তর্জাতিক কূটনীতি, গবেষণা নথি, মানবাধিকার প্রতিবেদন এবং নীতি নির্ধারকদের সাথে আলোচনার টেবিলে। জেএসএস খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ইউএনপিও-র মাধ্যমে নিজেদের দাবির পক্ষে একটি বৈশ্বিক সমর্থন বলয় তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সমাজকে এটি বোঝাতে চাইছে যে, বাংলাদেশের মূলধারা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন এবং সেখানে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন।

এই ধরনের প্রচারণা যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন বিশ্ব সম্প্রদায় খুব সহজেই যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সমস্যাকে আন্তর্জাতিক 'আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার' সংক্রান্ত জটিলতা হিসেবে দেখতে শুরু করে।

জেএসএস নেতাদের মূল পরিকল্পনা সরাসরি স্বাধীনতার দাবি হিসেবে তাদের দাপ্তরিক নথিতে না থাকলেও, আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের মিত্রদের তালিকা অন্য বার্তা দেয়। কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যখন দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার চেয়ে বিদেশি প্ল্যাটফর্ম ও তিব্বত-বেলুচিস্তানের মতো সংগঠনের ওপর বেশি ভরসা করে, তখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের মনে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের করণীয় কেবল আবেগপ্রবণ হয়ে বা জেএসএস-কে সরাসরি শত্রু আখ্যা দিয়ে শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটি কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডের যুদ্ধ নয়; এটি একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিক অধিকারের বিষয়, যা ১৯৯৭ সালের চুক্তির মাধ্যমেই নিষ্পত্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। স্থানীয় অবাঙালি জনগণের মধ্যে যেন কোনো ধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতা বা বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি না হয়। আন্তর্জাতিক ফোরামে একপেশে কোনো ন্যারেটিভ তৈরি যেন না হতে পারে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর তৎপরতা জরুরি।

জেএসএস যদি প্রকৃতপক্ষে বেলুচিস্তানের মতো পথ অনুসরণ করতে চায়, তবে সেটি অবাঙালি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের জন্যই এক অবর্ণনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে। বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে পা বাড়ালে পাহাড়ে চিরস্থায়ী সঙ্ঘাতের আগুন জ্বলে উঠবে, যা সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে। অন্যদিকে, জেএসএস যদি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর সংঘ ত্যাগ করে কেবল বাংলাদেশের সংবিধান ও শান্তিচুক্তির কাঠামোর মধ্যে নিজেদের দাবি আটকে রাখে, তবেই তা টেকসই সমাধানের পথ দেখাবে।

ইউএনপিও-র সাধারণ অধিবেশনে প্রতিনিধি পাঠিয়ে রেজুলেশন পাস করানোর খবরটি কেবল পত্রিকার ভেতরের পাতার কোনো হালকা সংবাদ নয়। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও অখণ্ডতার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তিব্বতি বা বেলোচদের মতো আন্তর্জাতিক কৌশল যদি জেএসএসের রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে সেটি সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক খেলায় ঠেলে দেবে। তাই সময়ের দাবি হলো, বাংলাদেশ যেন জেএসএসের এই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশলকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট