১০ নভেম্বর ১৯৮৩। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। খাগড়াছড়ির পানছড়ির পাহাড়ি জনপদে হঠাৎ গুলির শব্দ। লক্ষ্য ছিল একটি ঘাঁটি। সেখানে অসুস্থ অবস্থায় ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা)। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় তার জীবন। কিন্তু শেষ হয়নি প্রশ্নের। বরং সেই মৃত্যুর সঙ্গে পাহাড়ের রাজনীতিতে শুরু হয় আরও দীর্ঘ এক রক্তাক্ত অধ্যায়।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বয়স তখন ৪৪ বছর। তার মৃত্যুকে ঘিরে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে-তাকে হত্যা করেছিল কারা?
একটি পক্ষের বয়ান বলছে, এটি ছিল জেএসএসের অভ্যন্তরীণ বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি। হামলার পেছনে ছিল প্রীতি কুমার চাকমার নেতৃত্বাধীন বিরোধী গ্রুপ। অন্য পক্ষের বক্তব্য ছিল, সংকটের মূল কারণ এম এন লারমা ও তার অনুসারীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ব্যর্থতা।
আর পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত কিছু লেখায় প্রশ্ন উঠেছে আরও গভীর-হামলা যারা চালিয়েছিল, তারাই কি শুধু দায়ী? নাকি সংগঠনের ভেতরের আরও কেউ এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন, যাতে এম এন লারমা কার্যত অরক্ষিত হয়ে পড়েন?
জন্ম পাহাড়ে, রাজনীতির শুরু ছাত্রজীবনে
আজ এম এন লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের মহাপুরম গ্রামে জন্ম এম এন লারমার। পাহাড়ি রাজনীতিতে তিনি ‘মঞ্জু’ নামে পরিচিত ছিলেন।
ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ছিলেন তিনি। মহাপুরম জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে ১৯৫৮ সালে রাঙামাটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর বিএ, বিএড ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬৬ সালে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু শিক্ষকতার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
ছাত্রজীবনেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরের বছর যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে।
‘বাঙালি’ পরিচয়ের বিরোধিতা
স্বাধীনতার পর এম এন লারমা জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন সংবিধান প্রণয়নের সময়।
১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের ‘বাঙালি’ হিসেবে পরিচিত করার বিধানের বিরোধিতা করেন তিনি। সংবিধানের তৎকালীন ৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’
এম এন লারমা এর বিরোধিতা করেন। তার যুক্তি ছিল, বাংলাদেশের সব নাগরিকের জাতিসত্তা এক নয়। পাহাড়ের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে।
সংবিধান গ্রহণের সময় গণপরিষদ থেকে তার ওয়াকআউট তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর আগেই পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পার্বত্য চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন।
জেএসএস থেকে শান্তিবাহিনী
১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এম এন লারমা ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে যান।
এরপর জেএসএসের সশস্ত্র শাখা হিসেবে গড়ে ওঠে শান্তিবাহিনী।
পাহাড়ের রাজনৈতিক আন্দোলন তখন ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংঘাতের পথে এগোতে থাকে।
কিন্তু যে সংগঠনটি পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য গড়ে উঠেছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সংগঠনের ভেতরেই দেখা দেয় তীব্র ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
এক সংগঠন, দুই শিবির: দ্বন্দ্ব বন্দুকের মুখোমুখি
আশির দশকের শুরুতে জেএসএসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।
একদিকে এম এন লারমা ও সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন ধারা। অন্যদিকে প্রীতি কুমার চাকমা ও ভবতোষ দেওয়ানদের নেতৃত্বে বিরোধী গোষ্ঠী।
বিরোধের বিষয় ছিল শুধু ব্যক্তি বা নেতৃত্ব নয়। সংগঠন পরিচালনার পদ্ধতি, রাজনৈতিক কৌশল, আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং নেতৃত্বের কর্তৃত্ব নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
একসময় রাজনৈতিক মতবিরোধ বন্দুকের লড়াইয়ে পরিণত হয়।
দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে সঠিক দাবি করে এবং প্রতিপক্ষকে সংগঠনের বিভাজনের জন্য দায়ী করতে থাকে।
এ বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো দুই পক্ষের প্রকাশিত প্রচারপত্র।
১০ নভেম্বরের সেই রক্তাক্ত ভোর
১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার খেদারছড়ার থুম এলাকায় জেএসএসের একটি ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন এম এন লারমা ও তাঁর সহযোগীরা।
তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। একই এলাকায় ছিলেন তাঁর ছোট ভাই সন্তু লারমাও। তিনি তখন শান্তিবাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার এবং দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
ভোরে ঘাঁটিতে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
হামলায় এম এন লারমা নিহত হন। তার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন সহযোগী ও শান্তিবাহিনীর সদস্যও নিহত হন। তার বয়স হয়েছিল ৪৪ বছর।
পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি হয়ে থাকে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের স্মারক হিসেবে।
কিন্তু কে চালিয়েছিল সেই হামলা? কেনই বা জেএসএসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে প্রতিষ্ঠাতা নেতাকেই প্রাণ দিতে হলো?
এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর আজও বিতর্কের বাইরে নয়।
১০ নভেম্বরের আগে কী ঘটেছিল?
এখানেই আসে সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়।
উৎপল খীসা তার বইয়ে এম এন লারমার হত্যার আগে-পরে জেএসএসের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। বইটির একটি অধ্যায়ের শিরোনাম—‘দুই ষাঁড়ের উন্মত্ত দৌড় প্রতিযোগিতা’।
লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রীতি ও সন্তু—দুই পক্ষের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে আড়াল করে ফেলেছিল।
তবে বইটিতে এম এন লারমার নিজের নেতৃত্ব নিয়েও কঠোর সমালোচনা রয়েছে।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, সংকটের সময়ে এম এন লারমা নিরপেক্ষ ও সমন্বয়কারী নেতৃত্বের পরিবর্তে সন্তু লারমার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন। ফলে সংগঠনের ভেতরের বিরোধ মেটানোর সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে।
এখানে অবশ্য মনে রাখা দরকার, এগুলো লেখকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন; এগুলোকে সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো স্বাধীন প্রমাণের বিষয়টি আলাদা।
মৃত্যুর পরও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
এম এন লারমা হত্যার পর সন্তু লারমার পক্ষ থেকে ১৯৮৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এর পর ১৯৮৪ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রীতি কুমার চাকমার পক্ষ থেকেও ‘জাতির উদ্দেশ্যে জনসংহতি সমিতি’ শিরোনামে একটি প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়।
দুটি বিবৃতিতে একই ঘটনার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।
সন্তু লারমার পক্ষের বিবৃতিতে প্রীতি কুমার চাকমা, দেবজ্যোতি চাকমা, ভবতোষ দেওয়ান, ত্রিভঙ্গিল দেওয়ানসহ কয়েকজনকে ‘উপদলীয় চক্রান্তের’ সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর উদ্যোগের পরও বিরোধী পক্ষ গোপনে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর অতর্কিত হামলা চালিয়ে এম এন লারমাসহ তাঁর সহযোগীদের হত্যা করে।
অন্যদিকে প্রীতি কুমার চাকমার পক্ষের প্রচারপত্রে পুরো ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। সেখানে এম এন লারমা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, অগণতান্ত্রিক আচরণ এবং বাস্তবতাবিবর্জিত রাজনৈতিক কৌশলের অভিযোগ আনা হয়।
দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়, এম এন লারমার মৃত্যুর আগে জেএসএসের অভ্যন্তরীণ সংকট কতটা গভীর হয়েছিল।
দায় কার?
এম এন লারমার হত্যার দায় নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি অভিযোগ ছিল প্রীতি কুমার চাকমার নেতৃত্বাধীন গ্রুপের বিরুদ্ধে। সন্তু লারমার পক্ষের প্রচারপত্রে হামলাকারীদের ‘বিভেদপন্থী’ ও ‘চক্রান্তকারী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
প্রীতি কুমার চাকমার পক্ষ অবশ্য পাল্টা অভিযোগ করে-সংঘাতের জন্য দায়ী ছিলেন এম এন লারমা ও তার অনুসারীরাই। তাদের দাবি ছিল, জেএসএসের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংকটই শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অর্থাৎ, মৃত্যুর পরও এম এন লারমাকে ঘিরে দুই পক্ষের বয়ান পরস্পরবিরোধী থেকে যায়।
তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত কিছু লেখায় প্রশ্নটি আরও জটিলভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
লেখক উৎপল খীসা তার বইয়ে এম এন লারমার হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ১০ নভেম্বরের আগে ঘাঁটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, ৮ নভেম্বরের মধ্যেই লারমা গ্রুপের কাছে খবর পৌঁছেছিল যে প্রীতি গ্রুপ ৯ অথবা ১০ নভেম্বর বাঘমারা ঘাঁটিতে আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছে। ওই ঘাঁটিতেই তখন অসুস্থ এম এন লারমা অবস্থান করছিলেন।
যদি আক্রমণের আশঙ্কা আগেই জানা থেকে থাকে, তাহলে নিরাপত্তা কেন জোরদার করা হলো না-এই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
আরও প্রশ্ন উঠেছে, কেন ঘাঁটির একটি চৌকস দলকে গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঘাঁটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও বইটিতে প্রশ্ন করা হয়েছে।
এমনকি দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার ওই সময়ের অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েও লেখক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সন্তু লারমার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
এম এন লারমার মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি তার ছোট ভাই সন্তু লারমার ভূমিকা নিয়ে।
উৎপল খীসার বিশ্লেষণে অভিযোগ করা হয়েছে, এম এন লারমাকে হত্যার ক্ষেত্রে প্রীতি গ্রুপ সরাসরি হামলা চালালেও সন্তু লারমার ভূমিকা ছিল পরোক্ষ-তিনি নাকি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন, যাতে এম এন লারমা নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়ে যান।
লেখক আরও দাবি করেছেন, এম এন লারমার মৃত্যুর ঘটনায় প্রীতি ও সন্তু—দুই পক্ষই কোনো না কোনোভাবে দায়ী।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। প্রীতি গ্রুপের সরাসরি হামলার অভিযোগ এবং সন্তু লারমার বিরুদ্ধে পরোক্ষ ষড়যন্ত্র বা সহযোগিতার অভিযোগ একই ধরনের প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। দ্বিতীয় অভিযোগটি মূলত পরবর্তী লেখকের বিশ্লেষণ, প্রশ্ন ও অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।
তাই এম এন লারমার হত্যায় সন্তু লারমার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে আরও নির্ভরযোগ্য দলিল ও স্বাধীন গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
এম এন লারমা কি নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পেরেছিলেন?
এম এন লারমার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও রয়েছে নানা মূল্যায়ন।
উৎপল খীসা লিখেছেন, জেএসএসের প্রথম কয়েক বছর মাও সেতুংয়ের বিপ্লবী আদর্শের প্রভাব থাকলেও পরে সংগঠনটি সেই আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়। তাঁর মতে, সংগঠনের ভেতরের নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মতবিরোধকে ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত করে।
তার বিশ্লেষণে এম এন লারমার নিজের নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতাও উঠে এসেছে। বিশেষ করে সংকটের সময়ে তিনি কেন সন্তু লারমার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেছিলেন, কেন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ রাজনৈতিকভাবে সামাল দিতে পারেননি-এসব প্রশ্ন তুলেছেন লেখক।
অর্থাৎ, এম এন লারমার হত্যাকে শুধু ‘এক পক্ষের হামলা’ হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ঘটনাটি বোঝা যাবে না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সংগঠন পরিচালনার সংকট এবং সশস্ত্র রাজনীতির অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা।
একটি হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ছায়া
এম এন লারমার মৃত্যুর পর জেএসএসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাহাড়ের সশস্ত্র রাজনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
একদিকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকে। অন্যদিকে জেএসএসের ভেতরের বিভাজন ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাত পাহাড়ের মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার জন্ম দেয়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে জেএসএসের দীর্ঘ সংঘাতের একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি হয়। কিন্তু এম এন লারমার হত্যাকাণ্ড এবং সেই হত্যার দায় নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে
এম এন লারমা ছিলেন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাতন্ত্র্যের দাবির অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এমন এক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, যা একসময় সশস্ত্র সংগ্রামের পথে গিয়েছিল।
তার জীবন তাই একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংবিধানিক বিতর্ক এবং সশস্ত্র রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আর তার মৃত্যু যেন সেই ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়।
১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আসলে কী ঘটেছিল? হামলার নির্দেশ কে দিয়েছিল? প্রীতি গ্রুপের ভূমিকা কতটা ছিল? ঘাঁটির নিরাপত্তায় ব্যর্থতার কারণ কী? গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সিদ্ধান্তগুলো কি নিছক সাংগঠনিক ভুল ছিল, নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল? আর সন্তু লারমার বিরুদ্ধে যে পরোক্ষ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে, তার পক্ষে কতটা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়?
সময় পেরিয়ে গেলেও এসব প্রশ্নের সবগুলোর নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত উত্তর পাওয়া যায়নি।
ইতিহাসের বিচার হয়তো সবসময় আদালতের রায়ের মতো সরল হয় না। কখনো কখনো দলিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, প্রতিপক্ষের বক্তব্য এবং পরবর্তী গবেষণার টুকরো টুকরো তথ্য মিলিয়েই সেই ইতিহাসকে বুঝতে হয়।
এম এন লারমার মৃত্যুও তেমনই এক অধ্যায়-যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতার হত্যার সঙ্গে মিশে আছে একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ভাঙন, পাহাড়ের সশস্ত্র রাজনীতির উত্থান এবং ক্ষমতা ও নেতৃত্বের এক রক্তাক্ত সংঘাত।
আজ তার জন্মদিনে তাই এম এন লারমাকে স্মরণ করার পাশাপাশি ফিরে দেখা জরুরি সেই প্রশ্নটিও-কেন একজন রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা শেষ পর্যন্ত তার নিজের আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বলি হলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু অতীত বোঝার জন্য নয়, পাহাড়ের রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।


