মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ নীতির কারণে। একসময় অগ্রসর অবস্থানে থাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন বহু এলাকায় পিছু হটছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি।
জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ি এলাকায় গোপন একটি বিদ্রোহী শিবিরে থাকা চার তরুণ জানান, তারা কেউই এই যুদ্ধে জড়াতে চাননি। একইভাবে তারা সেনাবাহিনীর সদস্যও হতে চাননি।
তাদের একজন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় আটক হন। পরিচয়পত্র না থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করে বাধ্য করা হয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে। আরেকজনকে রাতের কারাওকে থেকে ফেরার পথে তুলে নেওয়া হয়। আরেকজন বন বিভাগের কর্মী থাকা অবস্থায় আটক হন। চতুর্থজনের অভিযোগ, তাকে গ্রেপ্তারের পর তার জুতায় মাদক রেখে ফাঁসানো হয় এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
তারা বলেন, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
একজন বলেন, ‘আমরা বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সামনের সারিতে পাঠানো হয়।’ আরেকজন বলেন, ‘আমাদের দিয়ে সব কাজ করানো হতো, বিশ্রাম প্রায় ছিল না।’
চার মাস প্রশিক্ষণের পর তাদের কায়েন রাজ্যের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়। এক রাতে গোসলের জন্য যাওয়ার সময় তারা পালিয়ে যায়।
পরে তারা বিদ্রোহী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) একটি টহল দলের কাছে ধরা পড়ে। এখন তারা ওই দলের সঙ্গেই আছে এবং নিজেদের সেখানে ‘ভাইয়ের মতো’ আচরণ করা হচ্ছে বলে জানায়।
তারা আপাতত পিডিএফের সঙ্গেই থাকবে। তবে পরে থাইল্যান্ড সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তাদের একজন বলেন, ‘এখন ফিরে গেলে সেনাবাহিনী আমাদের খুঁজে বের করতে পারে।’
বিবিসি তাদের পরিচয় গোপন রেখেছে যাতে তাদের পরিবার ক্ষতির মুখে না পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ নীতি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অবস্থান শক্ত করেছে এবং যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
একসময় দেশজুড়ে অগ্রসর থাকা বিদ্রোহী জোট এখন অনেক এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
তবে সেনাবাহিনী এখনো পুরো দেশের অর্ধেকেরও কম নিয়ন্ত্রণে রাখলেও বিভিন্ন অঞ্চলে তারা নতুন করে অগ্রগতি অর্জন করছে এবং কৌশলগত সড়ক ও শহর পুনর্দখল করছে।
এর আগে, বিদ্রোহী জোট দেশজুড়ে বড় সাফল্য পেলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় তারা প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে রয়েছে।
দেশটির সেনাবাহিনী এখনো পুরো দেশের অর্ধেকের কম নিয়ন্ত্রণে রাখলেও তারা নতুন করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখল করেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছে।
বিদ্রোহী কমান্ডার কো কুাং বলেন, বাধ্যতামূলক নিয়োগ সেনাবাহিনীর জন্য অসীম জনশক্তি তৈরি করেছে, যা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের প্রযুক্তিগত সুবিধা থাকলেও অর্থ ও সরবরাহে বড় সংকট রয়েছে।
অন্য এক বিদ্রোহী কমান্ডার ডা ওয়া জানান, রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির পর জান্তা বাহিনীর বিমান ও ড্রোন ক্ষমতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আগে একটিই বিমান দেখা যেত, এখন জোড়া বিমান দেখা যায়।’
বিদ্রোহীরা অভিযোগ করেছে, চীন কিছু এলাকায় অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করায় তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
এক আহত কমান্ডার জানান, ‘লড়াইয়ের ইচ্ছা আছে, কিন্তু অস্ত্র ও গোলাবারুদের ঘাটতি বড় সমস্যা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আবার যুদ্ধে ফিরব, শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।’
এক ফিল্ড হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, সীমিত বাজেট ও সরঞ্জাম নিয়েও আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা চলছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝেই এক বিদ্রোহী যোদ্ধার স্ত্রী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। শিশুটির নাম রাখা হয় ‘সু পে’—যার অর্থ ‘পূর্ণ হওয়া ইচ্ছা’।
শিশুটির বাবা বলেন, তিনি চান তার সন্তান একদিন একটি ‘স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক মিয়ানমার’ দেখুক।
সূত্র: বিবিসি


