দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা মিয়ানমারের মিতসোন জলবিদ্যুৎ বাঁধ প্রকল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির নতুন সরকার। প্রায় ১১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটি আগামী আট বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের কাচিন রাজ্যে অবস্থিত মিতসোন বাঁধ প্রকল্পটি ২০১১ সালে ব্যাপক জনবিক্ষোভ ও পরিবেশগত উদ্বেগের মুখে স্থগিত করা হয়েছিল। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরের পর প্রকল্পটি আবারও আলোচনায় আসে।

মিতসোন বাঁধটি হতে পারত মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু মানুষের ব্যাপক ক্ষোভের কারণে ২০১১ সালে এর নির্মাণকাজ স্থগিত করা হয়েছিল। কাচিন রাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য হতেত পাইং হতু রয়টার্সকে বলেন, খুব শিগগিরই প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হবে। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হবে এবং প্রেসিডেন্টও ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মুখপাত্র খাইং খাইং সোয়ে বলেন, বিদ্যুতের তীব্র সংকটে থাকা দেশের জন্য প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্থানীয় জনগণের বাস্তুচ্যুতি, বন্যা ও পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়গুলোও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে।

ব্যয় তিন গুণের বেশি হতে পারে

২০০৯ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩.৬ বিলিয়ন ডলার। তবে বর্তমান হিসেবে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে প্রায় ১১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের হিসাবের তিন গুণেরও বেশি। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) সাম্প্রতিক ব্যয় বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ ধারণা দেওয়া হয়েছে।

চীনের আগ্রহ, পুরোনো বিতর্ক

৬ গিগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৯০ শতাংশ চীনে রপ্তানির পরিকল্পনা ছিল। তবে মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি, বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং সিঙ্গাপুরের সমান আয়তনের এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রকল্পটি তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতার দিক থেকে মিতসোন বাঁধ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে জায়গা করে নেবে। তবে চীনের থ্রি গর্জেস ড্যামের তুলনায় এটি অনেক ছোট। থ্রি গর্জেস ড্যামের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট।

মিন অং হ্লাইংয়ের সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় প্রকল্পটি পুনরায় চালুর বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পায় বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, বিদ্যুতের প্রচণ্ড ঘাটতিতে থাকা একটি দেশের জন্য প্রয়োজনীয়—১০ গিগাওয়াটের অর্ধেকেরও বেশি—বিদ্যুৎ এ প্রজেক্ট থেকে পাওয়া সম্ভব।

পরিবেশ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি

সূত্রগুলোর দাবি, কাচিন রাজ্যের প্রশাসনপ্রধান খেত তেইন নান সাম্প্রতিক এক বৈঠকে বলেছেন, অতীতের তুলনায় চীন এখন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম। তাই প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে চলতি বছরের মার্চে মধ্য মিয়ানমারে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে হাজারো মানুষের প্রাণহানির পর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় এত বড় বাঁধ নির্মাণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিরোধিতা অব্যাহত

সরকার প্রকল্পটির পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা চালালেও বিরোধিতা থেমে নেই। সম্প্রতি ৪৯টি নাগরিক সমাজের সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে মিতসোন বাঁধ প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনগুলোর ভাষ্য, প্রকল্পটি জনগণের উপকারে আসবে না; বরং মানুষের জীবন, বসতভিটা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের মধ্যেই মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার এই প্রকল্প পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রকল্পটির বিরোধিতা করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চিও।