মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন ও দমন-পীড়ন চালাচ্ছে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)—এমন অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, আরাকান আর্মি দখলকৃত এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গাদের চলাফেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রয়েছে লুটপাট, নির্বিচারে আটক, মারধর, জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্তি এবং শিশুদের নিয়োগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, “রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যেভাবে নিপীড়ন চালিয়েছে, আরাকান আর্মিও এখন সেই পথেই হাঁটছে। এই অবস্থা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।”
২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে রাখাইনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় আরাকান আর্মি। যদিও তারা শুরুতে ‘সমতা ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের’ প্রতিশ্রুতি দেয়, বাস্তবে রোহিঙ্গারা আরও কঠোর শাসনের মুখোমুখি হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বুথিডং থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১২ জন রোহিঙ্গার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। একজন ষাটোর্ধ্ব রোহিঙ্গা বলেন, “ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। মাছ ধরা, চাষাবাদ- সব নিষিদ্ধ ছিল। কেউ কেউ ভিক্ষা করেও চলত।”
আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ভূমি দখল, কবরস্থান গুঁড়িয়ে ধানক্ষেতে দাফনের নির্দেশ, জোরপূর্বক চাঁদা আদায় এবং খাদ্যপণ্যের সরবরাহ সংকট তৈরিরও অভিযোগ উঠেছে। অনেকে জানিয়েছে, শ্রমের বিনিময়ে প্রথমে অর্ধেক মজুরি দেওয়া হলেও পরে তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রোহিঙ্গা কিশোরদের, এমনকি নাবালকদেরও জোরপূর্বক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। একজন অভিভাবক বলেন, “আমার ১৭ বছরের ছেলেকে নিতে এসেছিল। আমি তাকে দুই মাস লুকিয়ে রাখি, পরে পরিবারসহ পালিয়ে বাংলাদেশে আসি।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যাতায়াতের জন্য ‘পাস’ চালু করে আরাকান আর্মি, যার জন্য প্রতিদিন ৩–৫ হাজার কিয়াত (বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ১৪০–২৪০ টাকা) আদায় করা হয়। অনুমতি ছাড়া গ্রাম ছেড়ে বের হলেই গ্রেপ্তার, এমনকি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
সন্দেহভাজন সেনা বা বিদ্রোহী (আরসা) সংযোগ আছে এমনদেরও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। একজন ভুক্তভোগী জানান, “বুথিডং থানায় নিয়ে আমাকে বেত দিয়ে পেটানো হয়। এখনও ভালোভাবে হাঁটতে পারি না।”
এইচআরডব্লিউ বলছে, এসব নিপীড়ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘনের শামিল। সংস্থাটি আরও জানায়, বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময়ও আরাকান আর্মি ও আরসা মিলে পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত থেকে অর্থ আদায় করছে। পালাতে একজন রোহিঙ্গাকে গড়ে ৮–১২.৫ লাখ কিয়াত (৩৮০–৫৯৫ মার্কিন ডলার) পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
২০২৪ সালের মে থেকে এখন পর্যন্ত নতুন করে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ। এদের অনেকেই এখনো নিবন্ধিত নয় এবং তেমন সহায়তাও পাচ্ছেন না।
সংস্থাটির আহ্বান, রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে আরাকান আর্মির ওপর চাপ বাড়াতে হবে যেন তারা সব জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ন্যায্য ও মানবিক আচরণ করে।

-পার্বত্য সময়