মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কিউকতাউতে আরাকান আর্মি (এএ) নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি বৈঠকের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে যে, স্থানীয় রোহিঙ্গারা নিজেদের পরিচয় "রোহিঙ্গা" হিসেবে প্রকাশ করতে পারবে না। এ নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি।
নতুন বিধিনিষেধ ও শাস্তির হুমকি
২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তির তরফে জানা যায়, এএ'র কমান্ডার-ইন-চীফ মেজর জেনারেল টোয়ান মারত নাইং স্পষ্টভাবে বলেন, "যে কেউ 'রোহিঙ্গা' শব্দটি ব্যবহার করবে, তাকে মংডু থেকে আরসা (ARSA) সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে এবং তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে।"
এ ঘোষণার ফলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে থেকেই তারা আরাকান আর্মির শাসনের অধীনে নানা নিষেধাজ্ঞা ও দমনমূলক নীতির শিকার ছিল। নতুন এ সিদ্ধান্ত তাদের আরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
নজরদারি ও চলাচলে সীমাবদ্ধতা
আরাকান আর্মি কেবল নাম ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েই থেমে থাকেনি। স্থানীয় রোহিঙ্গাদের নিজেদের গ্রামে যেকোনো অপরিচিত লোকের প্রবেশের খবর এএ'কে জানাতেও বাধ্য করা হয়েছে। এতে তাদের স্বাধীন চলাফেরা আরও সীমিত হয়ে পড়েছে এবং প্রতিনিয়ত নজরদারির মুখে থাকতে হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ ও ক্ষোভ
নতুন নির্দেশনার ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভয় আরও তীব্র হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত এক রোহিঙ্গা বাসিন্দা জানান, "আমরা আগে থেকেই টিকে থাকার লড়াই করছি, এখন তারা আমাদের নামও কেড়ে নিচ্ছে।"
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এটি রোহিঙ্গাদের পরিচয় মুছে ফেলার ধারাবাহিক প্রচেষ্টারই একটি অংশ। ফ্রি রোহিঙ্গা কোয়ালিশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নে সান লুইনের মতে, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে অন্তত ২,৫০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে এবং ৪০,০০০ জন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার সতর্ক করে আসছে যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর চলমান নিপীড়ন ও তাদের পরিচয় দমনের প্রচেষ্টা গভীর সংকট তৈরি করছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও চলমান সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় রোহিঙ্গাদের অবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা তাদের মানবিক সহায়তা পাওয়া, ন্যায়বিচার চাওয়া ও নিজ দেশে বসবাসের অধিকার পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা
বর্তমানে আরাকান আর্মির শাসনের অধীনে রোহিঙ্গারা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। নতুন নিষেধাজ্ঞা তাদের অস্তিত্বকেই সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিউকতাউ ও রাখাইনের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসরত রোহিঙ্গারা আরও কঠোর দমনমূলক নীতির শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একজন রোহিঙ্গা কর্মী মন্তব্য করেছেন, "প্রথমে তারা আমাদের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়েছে, এখন তারা আমাদের নাম মুছে দিতে চায়। এটি আমাদের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার আরও একটি পদক্ষেপ।"
বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গাদের আশঙ্কা, যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে তাদের অস্তিত্ব আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং নিপীড়ন আরও তীব্র হবে।

-পার্বত্য সময়