মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে নতুন করে রাখাইন বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে বসতি গড়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছে দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মি (এএ)। মংডু, রাথিডং ও বুথিডং টাউনশিপের বহু গ্রামে এএ এবং তাদের রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লিগ অফ আরাকান (ইউএলএ) পরিকল্পিতভাবে জনসংখ্যা পুনর্বিন্যাস করছে। রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম রোহিঙ্গাখবর–এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ফলে খালি হওয়া এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে তালিকা করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাখাইনদের এনে বসতি স্থাপন করানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে উত্তর মংডুর আটটি গ্রাম পুরোপুরি রাখাইন বসতিতে রূপান্তরিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস জানিয়েছে, এএ নিয়ন্ত্রিত বহু গ্রামে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে সামরিক সাফল্যের পর দখলকৃত এলাকাগুলোতে তারা বাধ্যতামূলক শ্রমনীতি চালু করেছে, যেখানে প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত একজন সদস্যকে একদিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত শ্রম দিতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়নের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে এই চাপ মানবিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাখাইনের চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২০১৭ সালে সামরিক বাহিনীর অভিযান থেকে বাঁচতে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের সংখ্যা এখন প্রায় চৌদ্দ লাখে দাঁড়িয়েছে। নতুন দখল ও বসতি স্থাপনের ঘটনা ফিরতি পথকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

উখিয়ার ১৮ নম্বর ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা নুরুল আমিন জানান, মংডুর নিজের এলাকার বসতভিটায় ইতোমধ্যে নতুন ঘর উঠেছে এবং সেখানে রাখাইনদের বসানো হচ্ছে। তার ভাষায়, তাদের ফেলে আসা কৃষিজমিও আরকান আর্মির লোকজন দখল করে নিচ্ছে, আর বাধা দিতে যাওয়া অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আরেক রোহিঙ্গা যুবক আরিফ উল্লাহ বলেন, তারা যে ঘরবাড়ি রেখে এসেছে, সেগুলো এখন অন্যরা দখল নিয়ে বসবাস করছে। এটি রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার বড় পরিকল্পনার অংশ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রোহিঙ্গা কমিউনিটি সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অফ রোহাংয়ের সভাপতি মাস্টার সৈয়দউল্লাহ বলেন, আরাকান রোহিঙ্গাদের আদি ভূমি, আর তাদের একমাত্র লক্ষ্য ঘরে ফেরা। তিনি অভিযোগ করেন, আরকান আর্মি স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে তাদের ঘরবাড়ি দখল করে রাখাইন জনপদে রূপান্তর করছে। এভাবে চলতে থাকলে পুরো রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গাশূন্য হয়ে পড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক সমাজের নীরবতা এই সংকট আরও জটিল করে তুলবে।

উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও দুঃশ্চিন্তা বাড়ছে। স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গা আগমনে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবনে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে স্থানীয়দের। এ অবস্থায় টেকসই ও কার্যকর সমাধানই হতে পারে একমাত্র পথ।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর সমাধান হলো প্রত্যাবাসন, এবং বাংলাদেশ সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মানবিক সেবা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

রাখাইনে আরকান আর্মি ও মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর সংঘাত দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরকান আর্মি মংডুর বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও এক বছর পার হয়ে গেলেও তারা এখনো পুরো রাজ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। গুরুত্বপূর্ণ সিট্যুয়ে, কিয়াকফিউ ও মানাউং টাউনশিপে জান্তা বাহিনী এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ফলে সংঘাত থেমে না গিয়ে উল্টো এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা রূপান্তর, দখল ও নিপীড়নের নতুন ধারা দেখা দিচ্ছে যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা, এবং যার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষের ভবিষ্যতের ওপর।