বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ হলেও ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিচ্ছে এবং ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে— উল্লেখ করে বৈশ্বিক খাদ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রোববার (১৩ অক্টোবর) ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম-এর (FAO) মূল অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশের আয়তন ইতালির অর্ধেক, কিন্তু আমরা ১৭ কোটি মানুষকে খাদ্য দিচ্ছি, সেই সঙ্গে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকেও আশ্রয় দিচ্ছি।”

তিনি বলেন, “ক্ষুধা কোনো অভাবের ফল নয়; এটি মানবসৃষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা। ক্ষুধা দূর করতে হলে বিশ্ব অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।”

ড. ইউনূস তার বক্তব্যে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য ছয় দফা প্রস্তাবনা দেন—

 যুদ্ধ বন্ধ ও সংলাপ শুরু করা, যাতে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে খাদ্য পৌঁছানো যায়।

 এসডিজি বাস্তবায়নের অর্থায়ন বৃদ্ধি ও জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলা।

 আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, যাতে খাদ্য সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল থাকে।

 তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহায়তা দেওয়া অর্থায়ন ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে।

 রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যাতে বাণিজ্যনীতি খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত না করে।

 গ্লোবাল সাউথের তরুণদের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, “২০২৪ সালে বিশ্বে ৬৭ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, অথচ আমাদের খাদ্য উৎপাদন পর্যাপ্ত ছিল। এটি উৎপাদনের নয়, বরং নৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা।”

অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন— “যেখানে ক্ষুধা দূর করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার জোগাড় করা যায়নি, সেখানে অস্ত্র কেনায় বিশ্ব ব্যয় করেছে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এটাকে কি অগ্রগতি বলা যায়?”

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “আমাদের মুনাফাভিত্তিক পুরোনো অর্থনৈতিক পদ্ধতি কোটি মানুষকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সামাজিক ব্যবসার মডেল, যা লাভের জন্য নয়, বরং সমাজের সমস্যার সমাধানের জন্য।”

তিনি তার ‘তিন শূন্য বিশ্ব’— শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ— ধারণা তুলে ধরে বলেন, “এটি কোনো কল্পনা নয়, এটি মানবতার টিকে থাকার একমাত্র পথ।”

বাংলাদেশের অর্জন তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা ধান, সবজি ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশের মধ্যে। কৃষকরা উৎপাদনের নিবিড়তা ২১৪ শতাংশে উন্নীত করেছেন এবং জলবায়ু সহনশীল ১৩৩ জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ করেছি, ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছি, শক্তিশালী খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, অপুষ্টি কমিয়েছি এবং কৃষিকে সবুজ করছি— মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে।”

শেষে তিনি বলেন, “যুবসমাজ, নারী ও কৃষকদের বিনিয়োগ ও সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে ক্ষমতায়ন করতে হবে। তাহলেই আমরা শুধু ক্ষুধা দূর করতে পারব না, পৃথিবীকেই বদলে দিতে পারব।”