বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) দেওয়া মিয়ানমারের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের আদি জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করে তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মূলত গণহত্যার দায় এড়ানোর একটি কৌশল।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় মুছে দিতে চায়। তাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে ২০১৬-১৭ সালে পরিচালিত তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নৃশংসতাকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অথচ ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, রোহিঙ্গারা আরাকানের একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে বার্মিজদের দখলের বহু আগ থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এমনকি ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকারও ছিল। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে তাদের রাষ্ট্রহীন করতে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল—মিয়ানমারের এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘যুক্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ। সরকার বলছে, এ দাবির পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেনি মিয়ানমার। তৎকালীন রাখাইনের জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটলে তা বিশ্ববাসীর নজরে আসত এবং বড় ধরনের আর্থ-সামাজিক সংকট সৃষ্টি হতো।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু মিল থাকলেও তারা সম্পূর্ণ আলাদা একটি জনগোষ্ঠী। তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতি রয়েছে। ‘বাঙালি’ আখ্যা দেওয়া শুধু পরিচয় বিতর্ক নয়, বরং তাদের মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার একটি হাতিয়ার।
বাংলাদেশ অভিযোগ করে, গত আট বছরেও রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা নির্মূলের অশুভ ইঙ্গিত বহন করে।
বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের সে দেশের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য সময়


