মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তোতার দ্বীয়া দ্বীপের দখল নিতে আরাকান আর্মি (এএ) ও একাধিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই সংঘর্ষের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে। বিশেষ করে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক এখন চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা পাচার ও সীমান্ত চোরাচালান নির্বিঘ্ন রাখতে তোতার দ্বীয়া দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাফ নদী ও আশপাশের জলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অস্ত্র, মাদক ও লোকজন পারাপার সহজ হয়। এ কারণেই দ্বীপটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী।

রোহিঙ্গা নেতা নবী হোসেন ও তার অনুসারীরা দ্বীপ দখলের লড়াইয়ে সক্রিয় হওয়ার পর থেকেই মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি বাংলাদেশে এসে পড়ার ঘটনা বেড়েছে বলে জানান সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। টেকনাফের লম্বাবিল ও আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন প্রায় নিয়মিত গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে।

টেকনাফের লম্বাবিল সীমান্ত এলাকায় বহু মানুষ নাফ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন সীমান্তবর্তী জলপথে যেতে হয় তাদের। স্থানীয় জেলেরা জানান, মাছ ধরতে গিয়ে তারা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তোতার দ্বীয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে বর্তমানে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। কৌশলগত গুরুত্বের কারণে দ্বীপটি এখন পুরো অঞ্চলের সশস্ত্র সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

তাদের দাবি, তোতার দ্বীয়া দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ থাকলেই সীমান্তের ইয়াবা ব্যবসা ও চোরাচালান কার্যক্রম সহজে পরিচালনা করা সম্ভব। এ কারণেই দ্বীপটি দখলে নিতে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এই সংঘাতের ফলে মিয়ানমারের দিক থেকে ছোড়া গুলি সীমান্তবর্তী গ্রাম, চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে এসে পড়ছে। নারী ও শিশুরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো সময় প্রাণহানির আশঙ্কায় সীমান্তবাসীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সংঘাতের জেরে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে আসা ৫৭ জনের মধ্যে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিজিবি। পুলিশ ও বিজিবি সূত্র জানায়, সীমান্তে আটক অপর চারজন বাংলাদেশি জেলে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে গোলাগুলির মুখে পড়ে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে মিশে পড়েন। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি।

মামলায় অভিযুক্ত ৫৩ জনের মধ্যে একজন পুলিশ হেফাজতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অপর ৫২ জনকে মঙ্গলবার কক্সবাজার আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, তোতার দ্বীয়া দ্বীপকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংঘাত কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্বের জন্যও একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সীমান্ত অঞ্চলের এই অস্থিরতা আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।