বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের নানা অভিযোগ এবং এরপর সনাতন জাগরণের মঞ্চের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ভারতের সাথে ‘কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃশ্যত অবনতি’ ঘটেছে। এর জেরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি, সামাজিক মাধ্যমে পতাকা অবমাননার ছবি প্রচারসহ ভারত ও বাংলাদেশে পরস্পরবিরোধী আগ্রাসী প্রচারণা, কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘু কিংবা তাদের উপাসনালয়ে ভাংচুর-হুমকির অভিযোগ উঠে আসছে। 
শেষমেশ সোমবার (৩ ডিসেম্বর) আগরতলায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে হিন্দু সংঘর্ষ সমিতির ব্যানারে এক দল বিক্ষোভকারী হামলা চালায়। এ নিয়েও দুই দেশের বিবৃতি পাল্টা বিবৃতির পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে বলা হচ্ছে মূলত ৫ আগস্টের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের চিত্র পাল্টাতে থাকে। আর সম্প্রতি ধর্মীয় ইস্যুতে মোড় নেওয়া এসব ঘটনাগুলোকে পুঁজি করে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাজ্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলছে ভোট ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ। 
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ করে সংবাদ প্রচার করতে থাকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। 'হিন্দু' ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতি করা শুরু করে ভারতের বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার। বিশ্বব্যাপী হিন্দু রক্ষার অন্যতম ঢাল হিসেবে বিজেপিকে প্রদর্শন করতে বিতর্কিত চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতার ইস্যুতে বিবৃতি প্রদান করে উদ্বেগ জানায় ভারত সরকার। যদিও এর আগে এ ইস্যুতে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ চায় ইসকন।

বিজেপির প্রতিক্রিয়া

ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র কড়া বিবৃতির মধ্যেই তাদের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রেখেছে, তবে পশ্চিমবঙ্গে দলটির নেতারা কর্মী-সমর্থকদের রাস্তায় নেমে বাংলাদেশের ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানাচ্ছেন। বাংলাদেশ নিয়ে বেশ আগ্রাসী মনোভাব অনেক আগে থেকেই লক্ষণীয়।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতে বাংলাদেশিদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান শুভেন্দু। বুধবার (২৭ নভেম্বর) কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশনের দপ্তরে গিয়ে তিনি দাবি জানান, ভিসা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সীমান্ত বাণিজ্যেও অনুমোদন বাতিল করা হোক। শুভেন্দুর মন্তব্য, ‘মেডিক্যাল ভিসাও বন্ধ করতে হবে। তারা চিকিৎসা নিতে করাচি, লাহোর যান, এখানে আসবেন না।’
এর আগের দিন বাংলাদেশকে হুমকি দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘২৫ নভেম্বর রাতের মধ্যে চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুকে মুক্তি না দিলে ২৬ নভেম্বর থেকে সীমান্ত সনাতনীরা অবরোধ করবে। ভারত থেকে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে কোনও পরিষেবা বাংলাদেশে ঢুকতে দেব না’। একই সঙ্গে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনারের অফিসও টানা ঘেরাও অবস্থানের হুঁশিয়ারি দেয় নিজ ভূমি পশ্চিমবঙ্গেই পাত্তা না পাওয়া এই বিজেপি নেতা।
সোমবার (২ ডিসেম্বর) সনাতনী সংগঠনের পক্ষ থেকে পেট্রোপোল সীমান্তে  আয়োজিত এক সভা থেকে বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘ইউনুস হুঁশিয়ার, একদিনে শুধু কলকাতায় যে আবর্জনা বের হয়, ওটা ফেলে দিয়ে এলেই না ঢাকা পড়ে যাবেন আপনি। পাঙ্গা নিতে আসবেন না।’
আর ভবিষ্যৎ ভালো করতে চাইলে এখনই বাংলাদেশকে শুধরে যেতে হবে বলেও হুংকার দেন শুভেন্দু। তার কথায়, 'আমরা ঘোষণা করেছিলাম যে আজ পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে আজ বাণিজ্য বন্ধ থাকবে। আজ সকাল ছ'টা থেকে বাণিজ্য বন্ধ আছে। এটা ২৪ ঘণ্টা চলবে। আগামিকাল সকাল ছ'টা পর্যন্ত (এটা চলবে)।'
সনাতনীদের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে বলে দাবি করলেও এ সভা আয়োজনে কলকাঠি নেড়েছেন মূলত রাজ্য বিজেপির নেতারাই।
এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মহারাষ্ট্র ও ঝাড়খন্ড নির্বাচনকে সামনে রেখেও বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লাগাতার অপমানজনক আপত্তিকর সব মন্তব্য করে গেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া

পশ্চিমবঙ্গ সরকার গঠন করেছে মূলত মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন ভারতের আঞ্চলিক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলাদেশে জুলাই আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় দলটির সভাপতি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি আন্দোলনকারী ও আন্দোলনের নিহতদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছিল। 
সোমবার (২ ডিসেম্বর) বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনে যোগ দিয়ে তিনি বাংলাদেশে শান্তিসেনা (পিস কিপিং ফোর্স) পাঠানোর জন্য কেন্দ্রকে জাতিসংঘের সঙ্গে কথা বলার আর্জি জানান। মমতা বলেন, “আমাদের প্রস্তাব, কেন্দ্র রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে বাংলাদেশে শান্তিসেনা পাঠানোর আর্জি জানাক।”
বাংলাদেশে ভারতীয়রা আক্রান্ত হলে তার সরকার তা সহ্য করবে না বলে জানান মমতা। তিনি বলেন, “যদি বাংলাদেশে ভারতীয়রা আক্রান্ত হন, তবে আমরা তা সহ্য করব না। আমরা তাদের সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে পারি।”
এসময় তিনি আরও বলেন, “আমাদের পরিবার, সম্পত্তি এবং প্রিয় মানুষেরা বাংলাদেশে আছেন। ভারত সরকার এই বিষয়ে (বাংলাদেশ) যে অবস্থান নেবে, আমরা তা গ্রহণ করব। কিন্তু বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে ধর্মীয় কারণে কেউ অত্যাচারিত হলে আমরা তার নিন্দা জানাই। আমরা এই বিষয়ে ভারত সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করার আর্জি জানাচ্ছি।”
বাংলাদেশ নিয়ে কেন্দ্র চুপ করে রয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে বিজেপিকে তোপ দেগে তিনি বলেন, “আমি গত ১০ দিন ধরে দেখছি কেন্দ্রীয় সরকার চুপ করে রয়েছে। অথচ তাদের দল বলছে সব আটকে দেব। কিন্তু এই বিষয়ে আমাদের কোনও এক্তিয়ার নেই।” 
এর আগে বুধবার (২৭ নভেম্বর) বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে দেশের সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে তার সঙ্গে থাকবেন। পাশাপাশি, বাংলাদেশের ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া ও ভারতীয় নেতাদের ভোট-রাজনীতি

বিরোধী দুই দলের প্রায় একই অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে ভোটের হিসাব নিকাশ স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তাদের সংগঠনের শক্তি বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তাদের বড় হাতিয়ার ধর্মীয় উসকানি। এবারও সেরকম কিছু করার চেষ্টা করছেন তারা।
দৈনিক অধিকারের সম্পাদক তাজবীর সজীব বলেন, শুভেন্দু অধিকারীদের এটা একটা অপকৌশল। তারা ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে বিজেপিকে হিন্দুদের রক্ষাকারী হিসেবে দেখাতে চাইছে। ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে হিন্দুদের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে শেকড় মজবুত করতে চাইছে।
ধর্মীয় বিষয়ে তুলনামূলক সহনশীল দল হিসেবে পরিচিত অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু বাংলাদেশ বিষয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন মূলত বিজেপির হাত থেকে নিজস্ব ভোটব্যাংক রক্ষা করার কৌশল। 
তাজবীর সজীব বলেন, বাংলাদেশ ইস্যুতে পাশাপাশি নয় বরং এক ধাপ এগিয়ে মমতা ও তার দল। কারণ তারা জানে, বিজেপি যে হাওয়া তাদের ভোটব্যাংকে লাগিয়েছে, তারও চেয়ে বেশী গতিশীল না হলে রাজনৈতিকভাবে ধাক্কা খেতে হবে তৃণমূলকে।  তারা মনে করছে, বাংলাদেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো উচিত।
ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচারিত প্রোপাগান্ডা ও বাংলাদেশের সঠিক চিত্র সম্পর্কে সেদেশের নেতাদের ধারণা আছে বলেই তিনি বিশ্বাস করেন। তবে বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারতের পাশে বাংলাদেশকে রাখতে বাধ্য করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

-পার্বত্য সময়