চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে পূর্বে নির্ধারিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গায় ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (ডিআইজেড) বা প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই শিল্পাঞ্চলে উৎপাদিত প্রতিরক্ষা পণ্য দেশের নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিও করা হবে।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিচালিত হবে। পরবর্তীতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের জন্যও এটি উন্মুক্ত করা হবে।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সভায় অন্যান্য উপদেষ্টারাও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) নির্মাণ। এই জোনে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই বিভিন্ন দেশের পণ্য ও কাঁচামাল সংরক্ষণ এবং পুনঃরপ্তানির সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি কুষ্টিয়া সুগার মিলের অব্যবহৃত বিশাল এলাকায় একটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
সভা শেষে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সিদ্ধান্তগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও বক্তব্য দেন।
ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রসঙ্গে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, সামরিক শিল্পে অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ উৎপাদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। এসব পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, একেবারে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিশ্ব সামরিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ খাতে সক্ষমতা গড়ে তোলাও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বুলেট বা ট্যাঙ্কের এক্সেলের মতো পণ্য খুব উচ্চ প্রযুক্তির নয়। এসব খাতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে কি না, তা নিয়ে আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন, বেজা, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এনএসইজে) ৮৫০ একর জমিতে এই ডিআইজেড নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। জমিটি বর্তমানে খালি রয়েছে। উল্লেখ্য, জায়গাটি গত বছরের জুন পর্যন্ত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত ছিল, পরে সেটি বাতিল করা হয়।
ডিআইজেডে উৎপাদন ও রপ্তানির পরিমাণ, সম্ভাব্য রপ্তানি গন্তব্য এবং ভবিষ্যৎ সরকার এই প্রকল্প অব্যাহত রাখবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। তবে রপ্তানি বাজার নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকায় ভবিষ্যৎ সরকারও প্রকল্পটি এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদী।
ফ্রি ট্রেড জোন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে কোনো পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল নেই, যেখানে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পণ্য সংরক্ষণ ও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বাংলাদেশে আনতে সময় বেশি লাগে। কিন্তু যদি সেই তুলা দেশে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার বা অন্য দেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যেই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রায় ৬৫০ একর জমিতে এফটিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া সুগার মিল এলাকায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রসঙ্গে তিনি জানান, সেখানে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সড়ক অবকাঠামোসহ প্রায় ২০০ একর জমি প্রস্তুত রয়েছে। প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হন না- এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই ওই এলাকাকে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ৩৩১টি পৌরসভা এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ক্ষেত্রেও অনুমতির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভায় এফডিআই ইনসেনটিভ স্কিম গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এই স্কিম অনুযায়ী, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আনলে বিনিয়োগ পুঁজির ১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে পাবেন। এছাড়া বিনিয়োগ উন্নয়নে বর্তমানে থাকা ছয়টি কর্তৃপক্ষ একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রাথমিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বিডার অফিস খোলার নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়। এসব অফিসে স্থানীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে ভালোভাবে অবগত থাকবেন।
এদিকে একই দিনে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (মিডা) প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মিডার অধীনে এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনাল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। দ্রুত এই দুটি টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি একটি ফিশ প্রসেসিং কেন্দ্র স্থাপন এবং এ বিষয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ তৈরির সিদ্ধান্তও হয়।


