মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল হিসেবে নির্বাচন আয়োজন করছে- এমন অভিযোগ জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। আগামী ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে রাখাইনসহ বিদ্রোহী-অধ্যুষিত বহু এলাকায় জাল ভোটের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী শক্তি অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এই নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা প্রায় অনুপস্থিত।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চি সরকারের পতনের পর থেকে টানা পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সহিংসতার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের পথে হাঁটলেও জান্তা সরকারের এই উদ্যোগকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছেন না অধিকাংশ নাগরিক। বরং নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিসহ জান্তাবিরোধী শক্তিগুলো ইতোমধ্যেই এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এটি সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত করার একটি রাজনৈতিক কূটচাল মাত্র। এরই ধারাবাহিকতায় রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা জোরদার করেছে জান্তা বাহিনী। চলমান এই সংঘাতে হতাহত হচ্ছে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ, বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছে হাজারো পরিবার।
এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত রাখাইন রাজ্যে নির্বাচন হলে সেখানে জাল ভোটের আশঙ্কা প্রবল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। অনেকের আশঙ্কা, এই নির্বাচন রাখাইনের মানুষের নিরাপত্তা কিংবা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনো নিশ্চয়তা দেবে না।
নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না- সে বিষয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ, দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত এনএলডি নির্বাচনের বাইরে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের কোনো পরিবেশ নেই। ফলে এই নির্বাচনকে ‘পাতানো’ ও একতরফা বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এক দশকের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের নামে জান্তা সরকার ক্রমাগত বিমান হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। বর্তমানে রাখাইনের ১৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে ১৪টির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে- যা জান্তা সরকারের নির্বাচন আয়োজনের বাস্তব সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।


