ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়, শনিবার প্রথম প্রহরে নিজ কার্যালয়ে খামেনি নিহত হন। এই বিবৃতি ইরানের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে পাঠ করা হয়। খামেনির মৃত্যুতে দেশটিতে  ৪০ দিন শোক এবং সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছে এক গভীর শূন্যতা। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখে- কে হবেন তার উত্তরসূরি?

প্রায় চার দশক ধরে কঠোর হাতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এই প্রভাবশালী নেতা জীবদ্দশায় আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে যাননি। ফলে সংবিধান অনুযায়ী নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পড়েছে ৮৮ সদস্যবিশিষ্ট ধর্মীয় পরিষদ- অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস-এর ওপর।

 

সংকটকালে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর এই পরিষদ এখন পর্যন্ত মাত্র একবারই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করেছে। তিন দশকেরও বেশি আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে আলী খামেনিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এই অস্থির পরিস্থিতিতে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস আদৌ নিরাপদে বৈঠক করতে পারবে কি না।

সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা হতে হলে প্রার্থীকে পুরুষ, শিয়া আলেম এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যশীল হতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দক্ষতা ও নৈতিক কর্তৃত্বও আবশ্যক। বাস্তবে এই শর্তগুলোর ব্যাখ্যা এমনভাবে প্রয়োগ করা হতে পারে, যাতে সংস্কারপন্থী বা তুলনামূলক উদার আলেমরা শুরুতেই বাদ পড়ে যান।

বিশ্লেষকদের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন যে কয়েকজন সম্ভাব্য নামের কথা জানিয়েছে, সেগুলো নিয়েই এখন ইরানি রাজনীতিতে আলোচনা তুঙ্গে।

 

মোজতবা খামেনি 

খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার কেন্দ্রের অদৃশ্য অংশ হিসেবে পরিচিত। ধারণা করা হয়, ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং তাদের সহযোগী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

তবে বড় বাধা হলো- শিয়া ধর্মীয় পরিমণ্ডলে বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর ঐতিহাসিকভাবে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে এক সময় রাজতন্ত্র উৎখাত করেই ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাছাড়া মোজতবা কোনো উচ্চপদস্থ আলেম নন এবং রাষ্ট্রীয় কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্বেও ছিলেন না। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

আলিরেজা আরাফি 

কম আলোচিত হলেও আলিরেজা আরাফি ইরানের ধর্মীয় প্রশাসনে পরিচিত নাম। বর্তমানে তিনি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের ডেপুটি চেয়ারম্যান। এর আগে প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিল-এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কুমভিত্তিক ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান হিসেবেও তিনি পরিচিত।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, সংবেদনশীল ও কৌশলগত পদে আরাফির ধারাবাহিক নিয়োগ খামেনির ব্যক্তিগত আস্থার ইঙ্গিত দেয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় ততটা প্রভাবশালী নন, যতটা এই পদে প্রয়োজন হতে পারে।

মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি

অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের এই সদস্যকে ইরানের সবচেয়ে কট্টরপন্থী আলেমদের একজন হিসেবে দেখা হয়। বয়স ষাটের কাছাকাছি। কুমে অবস্থিত ইসলামিক সায়েন্সেস একাডেমির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

অ্যাকটিভিস্টভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরানওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, মিরবাঘেরি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাতকে অবশ্যম্ভাবী মনে করেন এবং বিশ্বাসী–অবিশ্বাসীর দ্বন্দ্বকে আদর্শিক বাস্তবতা হিসেবে দেখেন। এই অবস্থান তাঁকে রক্ষণশীল বলয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থী করে তুলেছে।

 

হাসান খোমেনি

ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনি নামের কারণেই আলাদা গুরুত্ব পান। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। তিনি খোমেনির সমাধিস্থলের দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও রাষ্ট্রীয় কোনো পদে নেই।

তাঁকে তুলনামূলকভাবে কম কট্টরপন্থী হিসেবে দেখা হয়। তবে নিরাপত্তা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন কাঠামোর সঙ্গে তাঁর প্রভাব সীমিত। ২০১৬ সালে তাঁকে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসে প্রার্থী হওয়ার অনুমতিও দেওয়া হয়নি, যা তাঁর রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে দুর্বল করে।

 

হাশেম হোসেইনি বুশেহরি

জ্যেষ্ঠ আলেম বুশেহরি অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের প্রথম ডেপুটি চেয়ারম্যান। বয়স প্রায় ষাট। উত্তরাধিকার নির্ধারণে যুক্ত প্রধান ধর্মীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং খামেনির আস্থাভাজন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে তাঁর পরিচিতি সীমিত। পাশাপাশি আইআরজিসির সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক না থাকাও তাঁকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

খামেনির পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে কে আসবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নিরাপত্তা সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং এর মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে ইরান আরও কঠোর পথে হাঁটবে, নাকি সীমিত হলেও নতুন দিকনির্দেশনার ইঙ্গিত দেবে।