আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিপীড়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা (জেনোসাইড) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই মামলায় গাম্বিয়া অভিযোগ করছে, মিয়ানমার রাষ্ট্র নিজেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে পরিকল্পিত সহিংসতা চালিয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার অধ্যাপক মেলানি ও’ব্রায়েন বলেন, আইসিজে কোনো ব্যক্তিগত অপরাধের বিচার করছে না; বরং এখানে একটি রাষ্ট্র গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে কিনা, সেটিই নির্ধারণ করা হচ্ছে। তার ভাষায়, এটি কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নয়- এখানে রাষ্ট্রের দায় বিচারাধীন।
গাম্বিয়ার পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে রাষ্ট্রীয় দায় প্রমাণে মাঠ পর্যায়ের নৃশংসতার বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করছেন। এর আগে আইসিজেতে মাত্র দুটি গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার শুনানি হয়েছিল- বসনিয়া বনাম সার্বিয়া (২০০৭) এবং ক্রোয়েশিয়া বনাম সার্বিয়া (২০১৫)। তবে আন্তর্জাতিক জুরিস্টস কমিশনের রিড ব্রোডি স্মরণ করিয়ে দেন, আদালত এখনো কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি, কারণ এ ধরনের রায়ে পৌঁছাতে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উচ্চ প্রমাণমান নির্ধারণ করা হয়।
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলিয়েট ম্যাকইনটাইর বলেন, গাম্বিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- আদালতের সেই কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, যেখানে বিচারকদের সামনে একমাত্র যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হতে হবে গণহত্যার অভিপ্রায়ের অস্তিত্ব।
গণহত্যার ইতিহাস ও ডিজিটাল ঘৃণার যোগসূত্র
গত ১২ জানুয়ারি শুরু হওয়া শুনানিতে গাম্বিয়া ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করছে যে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত। গাম্বিয়ার পক্ষে আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস গণহত্যা সনদের প্রণেতা রাফায়েল লেমকিনের লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
পরবর্তী শুনানিগুলোতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী তাৎমাদোর পরিচালিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এ গ্রাম ধ্বংস, গণহত্যা, ধর্ষণ ও বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। ও’ব্রায়েনের মতে, এসব উপস্থাপনা থেকে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়- গণহত্যার সুস্পষ্ট অভিপ্রায়।
তিনি বলেন, গাম্বিয়া রুয়ান্ডা, স্রেব্রেনিৎসা ও হলোকাস্টের মতো পূর্ববর্তী গণহত্যার সঙ্গে মিয়ানমারের ঘটনার কাঠামোগত সাদৃশ্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আইনি বৈষম্য এবং সামাজিক ঘৃণা ছড়াতে ফেসবুকের ব্যবহারের দিকটিও আদালতের নজরে আনা হয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা
মামলায় জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন এবং ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেশন মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম)-এর প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি ভুক্তভোগী, সাক্ষী ও সাবেক কর্মকর্তার গোপন সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, ভিডিও, আলোকচিত্র এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যদিও মিয়ানমার এসব প্রতিবেদনকে অবিশ্বস্ত বলে দাবি করছে, গাম্বিয়ার আইনজীবী পল রাইখলার বলেন, আইসিজে পূর্ববর্তী মামলাগুলোতেও এসব প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করে সেগুলোর ওপর নির্ভর করেছে। তার মতে, এই মামলাতেও সেটিই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
গণহত্যার অভিপ্রায় ও যৌন সহিংসতা
গাম্বিয়া বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরেছে। নারী ও শিশুদের ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনাসহ পুরুষ ও কিশোরদের যৌন নিপীড়নের তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ও’ব্রায়েন বলেন, গণহত্যার পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল লিঙ্গভিত্তিক- যেখানে পুরুষদের হত্যা এবং নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা চালানো হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আদালত যদি রায় দেয়, তবে তা গণহত্যার আইনি ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায় শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থার জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হবে। রিড ব্রোডির মতে, এটি দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েলসহ চলমান অন্যান্য গণহত্যা মামলার ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
তিন সপ্তাহের শুনানি শেষে বিচারকদের রায় দিতে কয়েক মাস সময় লাগবে। তবে চলতি বছরেই এই ঐতিহাসিক মামলার রায় আসতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সূত্র- জাস্টিস ইনফো ডট নেট


