প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই মিয়ানমারে জান্তা সরকারের ঘোষিত সাধারণ নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর এটিই দেশটিতে প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

রোববার তিন ধাপের এই নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট শুরু হয় সকাল ৬টায় এবং শেষ হয় বিকেল ৪টায়। নিরাপত্তা ঝুঁকি, সহিংসতা ও ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক সংশয়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত এই ভোটকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে সামরিক সরকারের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আয়োজিত ‘মঞ্চস্থ প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন।

আগের নির্বাচনের তুলনায় এবারের ভোটে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ভোটকেন্দ্রগুলোতে মূলত বয়স্ক ভোটারদের অংশগ্রহণই বেশি দেখা গেছে। আগামী ১১ জানুয়ারি ও ২৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এই নির্বাচনে মূলত জান্তা-সমর্থিত রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিচ্ছে। সেনাবাহিনী সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন আসলে সামরিক শাসনকে বেসামরিক রূপ দেওয়ার একটি কৌশল।

ভোটের দিন রাজধানী নেপিডোতে নিজের ভোট দেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচন দেশটির ৩৩০টি টাউনশিপের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা ভোটগ্রহণের বাইরে রয়ে গেছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে ৬৫টি নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।

ভোটের দিন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্ফোরণ ও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। মান্দালয় অঞ্চলে একটি রকেট হামলায় তিনজন আহত হন। থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী মিয়াওয়াড্ডি এলাকায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণে এক শিশুর মৃত্যু ও একাধিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

২০২০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়া ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) দল এবং অং সান সু চিকে এবারের নির্বাচন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। সু চিকে বিভিন্ন মামলায় মোট ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাকে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখা হয়েছে। এনএলডিসহ প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করায় গত নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ দল এবারের ভোটের বাইরে রয়েছে।

নতুন এক আইনের আওতায় নির্বাচন বিরোধিতা বা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে ইতোমধ্যে ২০০ জনের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এই আইনের আওতায় চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও কৌতুকশিল্পীসহ একাধিক পরিচিত ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক টম অ্যান্ড্রুজ নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, যে জান্তা বেসামরিক মানুষকে বোমা মারে, রাজনৈতিক নেতাদের বন্দি করে এবং ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে- তাদের আয়োজিত নির্বাচন কোনো নির্বাচন নয়, এটি বন্দুকের মুখে অভিনীত এক প্রহসন।

পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, এই নির্বাচনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আঞ্চলিক জোট আসিয়ানও জানিয়েছে, রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়া কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

পর্যবেক্ষকদের মতে, চীন ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সমর্থনে জান্তা সরকার এই নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তবে চলমান গৃহযুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, লাখো বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং ভেঙে পড়া অর্থনীতির বাস্তবতায় এই নির্বাচন মিয়ানমারকে স্থিতিশীলতার পথে নিতে পারবে- এ নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে।