রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হয়েছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে এই শুনানি শুরু হয়।

শুনানিতে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্মূলের লক্ষ্যেই মিয়ানমার তাদের জীবনকে পরিকল্পিতভাবে বিভীষিকাময় করে তুলেছে।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করে। জাতিগত নিধনের অভিযোগে এটি আইসিজেতে দায়ের হওয়া প্রথম মামলাগুলোর একটি এবং প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো এমন একটি মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হওয়ায় এর গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক।

আইসিজেতে শুনানিতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো বলেন, রোহিঙ্গারা সহজ-সরল ও শান্তিপ্রিয় মানুষ। তারা মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখত। কিন্তু মিয়ানমার তাদের ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। শুধু স্বপ্নই নয়, তাদের জীবনকে নৃশংস সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত করা হয়েছে, যা কল্পনাতীত।

শুনানিতে গাম্বিয়া দাবি করে, মিয়ানমার নিজেদের রাখাইন রাজ্যের প্রত্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে জাতিগত নিধন চালিয়েছে।

এর আগে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ওই অভিযানে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল ওই অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে’ বলে মত দেয়।

মামলার প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমার সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি আইসিজেতে উপস্থিত হয়ে গাম্বিয়ার অভিযোগকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করে এবং ২০২২ সালের জুলাইয়ে দেশটির উত্থাপিত ‘প্রাথমিক আপত্তি’ খারিজ করে দেন বিচারকরা। এর ফলে মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানির পথ সুগম হয়।

এই মামলাটি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা জাতিগত নিধন মামলার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চলমান শুনানি ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবস চলবে। এই শুনানিতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে। তবে বিষয়টির সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব সেশনে সাধারণ দর্শক ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি সীমিত থাকবে।